Madrasa-Studentশ্রদ্ধেয় আব্বা,
আমার সালাম নিবেন। আপনাকে আমার অনেক কথা বলার আছে। আপনাকে সামনাসামনি কথাগুলো বলতে পারবো না; আমার বলার সাহস নাই! তার জন্য খুব কষ্ট থেকে কথাগুলো লিখতে বসেছি।

আব্বা, মা কেমন আছে? আজকে মাকে খুব মনে পড়ছে। মার হাতের খাবারের কথা মনে পড়তেছে।

আব্বা জানেন? আজকে বড় হুজুরে আমাকে তার রাতের খাবার আনতে পাঠাইছিলো; আমি ইশা নামাজের পর পাঁচ বাটির একটি বড় টিফিন কেরিয়ার নিয়ে সেই ফ্লাওয়ার মিলের মালিকের বাসায় যাই। তারপরে পাঁচ বাটি ভরে খাবার নিয়ে আনার সময় মাংসের গন্ধ পাই। মনে মনে ভাবছিলাম, বড় হুজুর আমাকে একটু মাংস দিবেন। কিন্তু রাতে শুধু লাবরা দিয়েই ভাত খেতে হয়েছে।

আব্বা, সপ্তাহে মাত্র একদিন আমাদের মাংস দেয়। তাও সেগুলো পানছে লাগে। বাড়িতে মার হাতের মাংসের কথা আমার বারবার মনে পড়ে। মনে পড়ে ইলিশ মাছের কানশিরা ভাজি খাওয়ার কথা। মার হাতের মাংস রান্না কতো স্বাদ! আজকে মার জন্য অনেকক্ষণ কেদেছি।

আব্বা, আপনি আমাকে এইখান থেকে নিয়ে যান। আমার এই মাদ্রাসাতে থাকতে আর মন চাইতেছে না!

আব্বা, আমার দুই হাতে অনেক চুলকানি হয়েছে। রাতের বেলায় খালি চুলকায়। চুলকানির পর খালি কশ বের হয় আর জ্বলে! কি আর বলবো আব্বা, হুজুরেরা প্রতি শুক্রবারের দিন আমাদেরকে দিয়ে পায়খানা, পেশাবখানা পরিষ্কার করায়। পুকুরের কচুরিপানা পরিষ্কার করায়। বিকেলবেলা যে আমরা একটু বাইরে কোথাও ঘুরতে যাবো- সেটাও যেতে দেয় না। মাদ্রাসার মাঠ পরিষ্কার করায়।

আব্বা, আমার সেই স্কুলের কথা মনে পড়ে। সেখানকার স্যারেরা কতো ভালো ছিলেন। আমাকে কতো আদর করতেন। এখানকার হুজুরেরা খালি হাছান শেখ আর হাছান চৌধুরীকে পছন্দ করেন। তারা ভুল করলেও হুজুরেরা মারেন না!

আব্বা, প্রতিদিন আছরের নামাজের পর আমি মাদ্রাসার মাঠের পূর্বপাশের একটু উচু জায়গায় গিয়ে বসে থাকি। আমার খুব কান্না পায়, আমার কষ্ট হয়। বাস টার্মিনালের দিকে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি এই বুঝি আপনি চলে আসবেন। আমার আপনার কথা মনে পড়ে। মার কথা মনে পড়ে।

আব্বা, তাজুল হুজুরের কোরান তেলাওয়াত আমার খুব ভালো লাগে। মনে হয় শুধু তার কোরান তেলাওয়াত শুনি। কিন্তু তিনি যখন মারেন, মনে হয় এক্ষুণি বাড়িতে চলে যাই!

জানেন আব্বা? আজকে একটি ভুলের জন্য আমাকে দশবার বেত দিয়ে পিটিয়েছেন। কান ধরে এক ঘণ্টা দাড় করিয়ে রেখেছিলেন! এক দুই পৃষ্ঠার মধ্যে মাত্র একটা ভুল বলেছিলাম! আমার ডান হাতটা লাল হয়ে গেছে; ব্যথায় টনটন করতেছে!

আব্বা, একটা কথা বলতে খুব লজ্জা লাগতেছে আমার। তারপরও বলি, এই কথাটা আপনার জানা দরকার। আমার ডান পাশের সিটের সিকান্দারের পায়খানা করতে খুব কষ্ট হয়। একদিন রাতে সিকান্দারকে ছোটো হুজুরে কি যেনো করছিলো! সিকান্দারে দুই দিন খুব কানছিলো। আব্বা, আমার খুব ডর লাগতেছে। আমাকে তো আবার ছোটো হুজুরে ডেকে নেবে না!

আব্বা, সেদিন আপনি আমাকে যে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে গেছিলেন! সেটা আমি টিনের বাকসোর মধ্যে রেখেছিলাম! কিন্তু আজকে সেই টাকা আর খুঁজে পাচ্ছি না। আমার তিলেখাজা খেতে খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো!

আব্বা, সপ্তাহে একদিন আমাকে আর সিকান্দারকে মাদ্রাসা ঝাড়ু দিতে হয়। পানি দিয়ে ধুতে হয়! সেই দিন ঝাড়ু দিতে দিতে আমাদের হাত ব্যথা হয়ে যায়। পুকুর থেকে পানি টানতে টানতে কাহিল হয়ে পড়ি। আব্বা, ওইদিন রাতে আর পড়তে পারি না। খালি ঘুম আসে। আব্বা, আমাকে আপনি এইখান থেকে নিয়া যান!

আব্বা, কোরবানির ঈদের সময় হুজুরকে কতো বল্লাম বাড়িতে গিয়ে আপনাদের সাথে ঈদ করবো। কিন্তু হুজুরেরা মাদ্রাসা থেকেই বের হতে দিলেন না। আমাদেরকে দিয়ে ঈদের দিন গরুর চামড়া টানাইছে। আমাদের জামা-কাপড় চামড়ার রক্ত লেগে একেবারে লাল হয়ে গেছে।

আব্বা, হুজুরেরা ঈদের আগেও আমাদেরকে বিভিন্ন এলাকায় পাঠিয়েছিলেন! আমাদের প্রত্যেক বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে মাদ্রাসার জন্য চান্দা কালেকশন করতে হতো। আমার এগুলো ভালো লাগে না। আব্বা, আমাকে বাড়িতে নিয়ে যান!

আব্বা, আমি ভালো নেই। সবসময় আমার মন খারাপ থাকে। আমি এখানে ঘুড়ি নিয়ে খেলতে পারি না। এখানে টেলিভিশন নাই! সকালের নাস্তা, দুপুরের লাবরা আর রাতের বাসি খাবার আমার খেতে ইচ্ছে হয় না। খাবারের জন্য সিরিয়াল দিয়ে দাড়িয়ে থাকতে হয়। যে ডাল দেয় আব্বা, এক্কেবারে ঘাটের পানি!

আব্বা, আমার জন্য দোয়া করবেন। মাকে দোয়া করতে বলবেন।

ইতি, আপনার স্নেহের মানিক।

দুই
রহমান সাহেবের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তার ছোটো ছেলে মানিক চিঠি পাঠিয়েছে। পাবনা জামেয়া আশ্রাফিয়া মাদ্রাসা থেকে চিঠিটি তার কাছে এসে পৌঁছেছে সাতদিন পর। অথচ যেখানে পাবনা থেকে মানিকগঞ্জের কল্যাণপুর গ্রামে পৌঁছতে ঘণ্টা তিনেক সময় লাগে!

রহমান সাহেব চিঠিটি টেবিলের ওপরে রেখে চোখ থেকে চশমাটি খুলেন। কাধে থাকা গামছা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে চেয়ার থেকে উঠে দাড়ান। আলনা থেকে পাঞ্জাবি আর পায়জামা নিয়ে পড়েন। এরপর দরজার পাশে থাকা বাকা লাঠিটি হাতে নিয়ে উঠোনের মাঝ বরাবর গিয়ে হুংকার দেন।
‘মর্জিনা কই রে’

পাছ-দুয়ারে হেঁসেল ঘরে মানিকের মায়ের সঙ্গে মর্জিনা কাজ করছিল; সেখান থেকে রহমান সাহেবের হুংকার শুনে দ্রুত বের হয়। পেছনে পেছনে মানিকের মায়ও যায়।

রহমান সাহেব উঠোনে পায়চারি করছেন। তার চোখ মুখ রাগে-ক্ষোভে জ্বলজ্বল করছে; মর্জিনা গিয়ে তার সামনে কাচুমাচু হয়ে দাড়ায়! মানিকের মায় পাছ-দুয়ারের গেটে। রহমান সাহেব মর্জিনাকে বলেন,
‘জলদি দুইটা মোরগ ধর।’

মর্জিনা মাথা নাড়িয়ে স্বীকার করে, সে মোরগ ধরবে। রহমান সাহেবের কণ্ঠে ঝাঁঝ!
‘মানিকের মায়কে দুইটা মোরগই কশাইতে বলবি’

এমন কণ্ঠ এর আগে মর্জিনা শুনেনি! মর্জিনা কোনোমতে রহমান সাহেবের সামনে থেকে মানিকের মায়ের কাছে আসে। এবার রহমান সাহেব উঠোনের পাশে গরুর গোয়ালের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করেন,
‘গজনবী শার্টটা গায় দিয়ে নে, পাবনা যেতে হবে’

গজনবী গরুকে ঘাস দেওয়া বাদ দেয়। দ্রুত কাচারি ঘর থেকে শার্ট গায় দিয়ে রহমান সাহের কাছে এসে দাড়ায়।
‘চাচা, চলেন’

এবার মর্জিনার মায় পাছ-দুয়ারের গেট থেকে আস্তে আস্তে রহমান সাহেবের কাছে আসেন। বলেন,
‘মানিকের বাপ, কি হইছে?’

রহমান সাহেব তার লাঠিটি উঠোনের ওপর জোড়ে একটা আছাড় দিয়ে বলে উঠেন,
‘মানিকরে হাফেজ বানানোর গুষ্ঠি মারি!’