peer‘শুনছোস? একটা তাজা পাথর পাওয়া গেছে!’
‘কী বলছিস? তাজা পাথর!’
‘হ্যা! সেই পাথরে হাত দিলে পাথর নড়ে!’
‘তাই নাকি!’

কথা হচ্ছিলো আয়াতুল্লাহর সাথে। আমরা যে চারজনে বিকেল বেলা আড্ডা দেই সেই আড্ডা গ্রুপের ঔ একজন। ও আমাকে জানায়, রুপসা গ্রামে আবদুল হক মুনশির বাড়িতে নাকি একটি তাজা পাথর পাওয়া গেছে। সেই পাথরটির ওপরে হাত দিলে সেটি আবার নড়াচড়াও করে। পাথর দেখতে অনেক লোজকজন জড়ো হয় প্রতিদিন।
আমরা বসে আছি উথলী ডাকবাংলোর মাঠের সবুজ ঘাসের ওপর। আমাদের আড্ডার আজকের টপিক হয়েছে তাজা পাথর। বিষয়টা খুব ইন্টারেস্টিং। পাথর সেটা আবার তাজা! ইতোমধ্যে নাজমুলও এসে হাজির। একমাত্র ঔ আমাদের পাঁচজনের মধ্যে কনিষ্ঠ এবং একটু মোটাসোটা। নাজমুলকে পাঠালাম রুবেলকে ডেকে আনতে। রুবেল একটু ঢিলা টাইপের। স্কুল থেকে বাড়িতে আসার পর খালি ঘুমায়।
নাজমুল রুবেলকে ডাকার আগে আরও একটি তথ্য দেয় আমাদেরকে। ও বলে,
‘ভাই জানেন? মানুষজন দুধ ঢাইলা সেই তাজা পাথরটারে সাদা বানাইয়া ফালাইতাছে!’
‘তাই নাকি?’
‘হ ভাই!’
‘আচ্ছা ঠিকাছে, তোর কথা পরে শুনবোনি। আগে তুই রুবেলকে ডাইকা নিয়া আয়।’
নাজমুল রুবেলের বাড়ির দিকে দৌড় দেয়। আয়াতুল্লাহ পেছন থেকে ওকে ডাক দিয়ে বলে,
‘ওই নাজমুল, বাবলুর দোকান থেকে এক প্যাকেট চানাচুর আর নিয়া আছিস?’
নাজমুল হাত নাড়ায়ে বলে,
‘ঠিকাছে।’

দুই
রুপসা গ্রামের উদ্দেশে আমরা হাটছি। উথলী গোডাইন রোড দিয়ে হেটে হেটে যাবো। আমরা চারজন। সবার মুখে একটাই কথা। পাথর আবার তাজা হবে কেমনে? কৌতুহল আর আগ্রহ আমাদের হাটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই গ্রামে। এর মধ্যে রুবেল আরও একটি তথ্য দেয় আমাদেরকে। ও বলে,
‘আমি শুনেছি, ওই পাথর নাকি শুধু সৎ মানুষের স্পর্শে নড়ে।’
‘তাই নাকি!’
‘হ। খালি নড়েই না! মনের সব কথাও নাকি বোঝে!’
‘তাই নাকি!’
‘হক মুনশিই নাকি প্রথমে স্বপ্নে দেখছিলো পাথরটিকে!’
‘তাই নাকি!’
আমার এই তাই নাকি কথাটা শুনে নাজমুল রেগে যায়। ও বলে,
‘ভাই, আপনি শুধু তাই নাকি! তাই নাকি! বলতেছেন কেন্?’
নাজমুলের কথা শেষ হতে না হতেই আয়াতুল্লাও বলে ওঠে,
‘আসলেই তো! আমরা সবাই সবার কথা বললাম, অথচ তোর কোনো কথা নাই!’
এবার আয়াতুল্লাহর পর রুবেল আমাকে ধরে বসে। ও বলে,
‘তাজা পাথর সম্পর্কে তোর বক্তব্য কি?’
‘আগে চলতো! তারপরে বলবো।’
ইতোমধ্যে আমরা রুপসা গ্রামে চলে গেছি। এবার ইছামতী নদী পার হলেই আমরা সেই মুনশির বাড়ি পাবো। নদীর ঘাটেও অনেক মানুষ জটলা করছে ওপারে যাওয়ার জন্য। তাদের হাতে কলস, মগ আর দুধের বোতল দেখে বুঝলাম তারাও যাবে ওই মুনশি বাড়িতে।
নদীর এবার থেকেই বোঝা যাচ্ছে। অনেক মানুষজন জড়ো হয়েছে সেই বাড়িতে। সবারই নতুন জামা গায়। একেবারে ঈদ ঈদ ভাব। তবে তাদের মধ্যে বেশির ভাগই মহিলা। কারো চুলে লাল ফিতে বাঁধা, কারো হাতে অনেকগুলো চুরি। নৌকা ওইপাড়ে থাকায় আমরা সেই জটলার মধ্যে মিশে যাই।
রুপসা আমাদের পাশের গ্রাম হওয়ায় জটলার মধ্যের বেশ কয়েকজন সহপাঠী পেলাম আমরা। তাদের মধ্যে একজন ছিলো স্বপন। স্বপনের হাতে কলস। ওকে ডেকে বললাম-
‘তুই আবার কি মান্নত করছোস রে?’
‘না। মানে! আসলে খালা আমাকে নিয়া আইছে।’
‘ও, আচ্ছা!’
স্বপন আমাদের নতুন আরও একটি তথ্য দেয়। পাথরে দুধ ঢেলে মান্নত করে ওর চাচীর নাকি পেটের অসুখ ভালো হয়েছে। এ কথা শুনে আমাদের আরও কৌতুহল বেড়ে যায়।

তিন
মুনশির বাড়ির পুরো উঠোন ভরা মানুষ আর মানুষ। বাশ দিয়ে বেড়া দেওয়া হয়েছে। লম্বা দুটি লাইন; একটি মহিলাদের আরেকটি পুরুষদের। কারো হাতে দুধের কলস, কারো হাতে মোম, কারো হাতে আগরবাতি আবার কারো হাতে কেজি খানেক চাল! মুনশির বড় ঘরটির বারান্দায় তিনজন পুলিশক সদস্যকেও দেখি, বসে বসে কি যেনো খাচ্ছে!
আমরা চারজন একসঙ্গে খুব মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছি। আস্তে আস্তে মেইন জটলার কাছে যাই। গিয়ে আমরা সবাই অবাক! হক মুনশি একটি শীতল পাটিতে বসে আছে। তার ডান পাশে বড় একটি মাদুরে জমা করা হচ্ছে চাল আর বাম পাশে জমা করা হচ্ছে মোমবাতি আর দুধ। আর দুধের কিছু অংশ ঢালা হচ্ছে হক মুনশির সামনে ধূসর রঙের বড় একটি পাথরের ওপর।
লোকজন সবাই সিরিয়াল দিয়ে দাড়িয়ে আছে। আমরা সিরিয়াল ছাড়াই ওই পাথরের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছি। রুবেল, আয়াতুল্লাহ আর নাজমুলের দৃষ্টি সিরিয়ালে দাড়ানো লোকজনের দিকে! কে কি বলছে তারা সেগুলো নোট করছে। আর আমার দৃষ্টি সেই পাথরের দিকে!

চার
আজকে সকাল বেলা এসেছি আমরা হক মুনশির বাড়িতে। এবার বড় একটা প্ল্যান করে এসেছি। সকালে মানুষের ভিড় কম। আজকে সেই বারান্দায় চারজন পুলিশ সদস্যকে দেখতে পাই। আমরা প্রথমে সেখানে গিয়ে পুলিশদের সাথে কথা বলি। আমার পকেট থেকে সাপ্তাহিক আলোর বাণীর স্টাফ রিপোর্টারের কার্ড দেখিয়ে পরিচয় দেই এবং আমাদের প্ল্যান বলি।
প্ল্যান মোতাবেক আমরা চারজন সকাল থেকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজে লেগে যাই। আমি আর রুবেল গিয়ে দাড়াই চালের বস্তার কাছে। আগত মানুষজনের কাছ থেকে চাল নিয়ে নিয়ে বস্তায় রাখি। আয়াতুল্লাহ আর নাজমুল গিয়ে দাড়ায় মোমবাতি, আগরবাতি আর দুধ রাখার জায়গায়!
আস্তে আস্তে লোকজনের সংখ্যা বাড়তে থাকে! জোহরের আজানের শব্দ ভেসে আসে কানে। হক মুনশি আমাদের রেখে বাড়ির ভেতরে যান নামাজ আদায়ের জন্য। তখন আমরা চাল, দুধ আর মোমবাতি না নিয়ে লোকজনকে সিরিয়ালে দাড়িয়ে থাকতে বলি। নাজমুলকে দিয়ে এক বালতি পানি আনিয়ে নেই। তারপর আমরা চারজনে পাথরটিকে পরিস্কার করতে থাকি।
খুব সতর্কতার সাথে পাথরটিকে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছি। হক মুনশি নামাজ আদায় করে এসে আমাদেরকে ধমক দেন এবং খুব রাগারাগি করেন। আমরা আমতা আমতা করি। ভয় পাওয়ার ভান করি। পুলিশ সদস্যরাও এগিয়ে আসেন। চারজনে মিলে একটানে পাথরটিকে তুলে ফেলি! দেখি নিচে বড় একটি কচ্ছপের বাসা! #