বিনোদনের নামে বিপদের দোরগোড়ায় তরুণরা
ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় আগুন যেন এক ধরনের বিনোদনের উপকরণ হয়ে উঠেছে। টিকটক, শর্টস বা রিলসে আগুন নিয়ে স্টান্ট করার প্রবণতা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। কিছুদিন আগে একটি ভিডিওতে দেখা গেল, একজন কড়াইভর্তি আগুন নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। দুজন পথচারী এসে আগুনের তাপ নিলেন, আর তিনি সুযোগ বুঝে তাদের কাছ থেকে কিছু টাকা নিলেন। দৃশ্যটি মুহূর্তেই ভাইরাল হলো। কিন্তু এই হাসিঠাট্টার আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় ধরনের ঝুঁকি, যা হয়তো ভিডিও দেখার সময় আমরা বুঝতেই চাই না।
এর চেয়েও বেশি ভয়াবহ একটি ঘটনা ঘটে আরেক তরুণ কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের সঙ্গে। তিনি পুকুরের ওপর মাচা বানিয়ে গোসলের ফানি ভিডিও তৈরি করছিলেন। পানিতে পেট্রল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে তার মধ্যেই ঝাঁপ দেন। দুঃসাহসী দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধরা পড়লেও তার পরিণতি ভয়াবহ। তার শরীরের প্রায় ৩৫ শতাংশ পুড়ে যায় এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। মজা করতে গিয়ে তার জীবনই ঝুঁকিতে পড়ে যায়। সবকিছু নিয়ে হাসাহাসি বা খেলাচ্ছলে কনটেন্ট বানানো যে কখনো কখনো নিজের জন্যই বিপদ বয়ে আনে, এই ঘটনাটি তার স্পষ্ট প্রমাণ।
গত বছর আয় বাড়ানোর আশায় নিজের পাঁচ লাখ টাকার মোটরবাইকে আগুন লাগিয়ে ভিডিও করেছিলেন এক তরুণ বাইকার। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। অথচ সেই ভিডিও থেকে তার আয় হয়েছিল মাত্র বাইশ হাজার টাকা। ক্ষুদ্র লাভের আশায় নিজের মূল্যবান সম্পদ পুড়িয়ে ফেলা এবং তার আগে নিজের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া। এটাকে কিভাবে স্বাভাবিক বলা যায়?
শীত এলেই আগুন নিয়ে কন্টেন্ট তৈরির হিড়িক যেন বেড়ে যায়। কেউ আগুনে পা দিচ্ছেন, কেউ আগুন হাতে নিয়ে দৌড়াচ্ছেন, কেউ আবার আগুনে ভরা জায়গার ওপর লাফ দিচ্ছেন। ভাইরাল হওয়ার নেশায় অনেকে বুঝতেই পারেন না যে আগুন কোনো খেলার জিনিস নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও কখনো বাস্তবের ক্ষতির সঙ্গে তুলনা হয় না।
অসুস্থ প্রতিযোগিতা, দ্রুত খ্যাতি আর ভিউয়ের লোভ তরুণদের অনেকে এক ধরনের কৃত্রিম দুঃসাহসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনেকে আবার ভাবেন, দর্শক বাড়লেই জীবন পরিবর্তন হয়ে যাবে। কিন্তু সেই দর্শক কি কখনো ভাবেন যে তারা যেটা দেখে হাসছেন, সেটার জন্য কেউ বড় ধরনের দুর্ঘটনার মুখে দাঁড়িয়ে আছে? ভাইরালের আনন্দ ক্ষণিক, কিন্তু আগুনের ভুল ব্যবহার আজীবনের ক্ষত তৈরি করতে পারে।
ফানি বা বিনোদনমূলক কনটেন্ট বানানো দোষের কিছু নয়। বরং সৃজনশীল, ইতিবাচক এবং নিরাপদ কনটেন্ট যে ভালো প্রভাব ফেলতে পারে, তার নজিরও অসংখ্য। তবে যে কোনো কনটেন্টের আগে সবচেয়ে জরুরি হলো নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আপনার ভিডিও যেন কাউকে ভুল পথে না ঠেলে দেয়, সেই দায়ও কনটেন্ট নির্মাতারই। একজন নির্মাতার কাজ শুধু বিনোদন দেওয়া নয়, দায়িত্বশীল হওয়াও জরুরি।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে দর্শক পাওয়ার প্রতিযোগিতা থাকবে, স্টান্টও থাকবে। কিন্তু স্টান্ট করার আগে যদি একটু ভেবে নেওয়া যায়, যদি নিজের জীবনের মূল্যটা মনে রাখা হয়, তাহলে হয়তো এসব অকারণ দুর্ঘটনা কমে যাবে। ভাইরাল হওয়ার আনন্দ আছে, কিন্তু তার জন্য আগুন নিয়ে খেলা কখনোই যুক্তিসংগত নয়। বিনোদনের মান বাড়ুক, কিন্তু জীবন নিয়ে খেলা যেন আর না বাড়ে।
(কালের কণ্ঠ । ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫)
মন্তব্যসমূহ