বিশ্বাসের দেয়ালে যে ফাটল তৈরি হচ্ছে

 

মা-বাবা দুজন চাকরি করলে সন্তানের দেখাশোনার জন্য গৃহকর্মীর ওপর ভরসা করাটা এখনকার শহুরে জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা। সন্তান ছোট থাকলে তো আরো বেশি। সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে সন্ধ্যা—ঘরের কাজ, বাচ্চাদের খাওয়া, খেলা, পড়া সবকিছুই সামলে নিতে হয় তাদেরই। অনেক পরিবারে আবার গৃহকর্মী বাসাতেই থাকেন। কখনো তারা বদলে যান, কখনো হঠাৎ আর আসেন না। কিন্তু যেভাবেই আসা-যাওয়া হোক, এই মানুষগুলো আমাদের ঘরের ভেতরের সবকিছুর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন।

সন্তানের নিরাপত্তা, ঘরের চাবি, ফ্রিজের খাবার, আলমারি, পানির বোতল— সবকিছুতে তাদের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকে। কেয়ারটেকার বা সিকিউরিটি গার্ড কেউই তাদের থামায় না। ফলে স্বভাবতই একধরনের নির্ভরতা তৈরি হয়। আবার সেই নির্ভরতাই আমাদের ভেতরে ভয়ের সঞ্চার করে। যারা প্রতিদিন বাড়িতে আসেন, যাদের ওপর নির্ভর করে আমরা নির্দ্বিধায় অফিসে যাই, তারাই চাইলে মুহূর্তেই বিপদ ডেকে আনতে পারে। এ কথাটা ভাবলেই মনে শীতল স্রোত বয়ে যায়।

অনেকেই নিরাপত্তার জন্য বাসায় সিসি ক্যামেরা লাগান। অফিসে বসে সন্তানের কী অবস্থা, ঘরের কাজ ঠিকঠাক হচ্ছে কি না। এসব দেখে একটু ভরসা পান। কিন্তু এই নজরদারিও সব সময় যথেষ্ট নয়। কারণ ভয়টা থাকে ভেতরে ভেতরে। যে ঘরে আমরা সবচেয়ে নিরাপদ বোধ করি, সেই ঘরেই যদি অনিরাপত্তার বীজ রোপিত হয়, তাহলে আশ্রয় বলব কোনটাকে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আজকের ঘটনায় এই অনিরাপত্তা আরো তীব্র হয়ে ওঠে। পুলিশের সন্দেহ এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ধারণা করা হচ্ছে, এক গৃহকর্মী যেভাবে এক মা ও তার মেয়েকে হত্যা করেছে, সেটি কোনোভাবেই কল্পনার মধ্যেও আসে না। ঘটনাটি দ্রুত ঘটে গেছে, কিন্তু যে ক্ষতি রেখে গেছে, তা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। বাবা ঘরে ফিরে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তার চোখে শুধু বিস্ময় আর শোকের ভার। মেয়েটির সেদিন পরীক্ষা ছিল। সবকিছু থেমে গেল একমুহূর্তে। একটি পরিবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক মূলত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সমাজে থাকা মানেই একে অপরকে বিশ্বাস করার দায় আসে। কিন্তু যখন সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়, তখন চারপাশটাই অপরিচিত মনে হয়। আজ আমরা যাদের ওপর নির্ভর করি, আগামীকাল সেই নির্ভরতা সন্দেহে পরিণত হবে কি না। এ প্রশ্ন থেকেই যায়।

তবু জীবন থেমে থাকে না। আমরা আবারও মানুষকে বিশ্বাস করি, কারণ বিকল্প নেই। তবে সেই বিশ্বাস যেন অন্ধ না হয়। পরিবার, সন্তান, ঘর-সবকিছুর নিরাপত্তায় সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বিশ্বাস থাকতে পারে, কিন্তু সেই বিশ্বাসের সঙ্গে সতর্কতার ভারসাম্যটাও জরুরি। সমাজের সব মানুষই খারাপ নয়, কিন্তু কিছু ঘটনা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—বিশ্বাস করতে হলে চোখ খোলা রাখতেই হবে।

(কালের কণ্ঠ । ৮ ডিসেম্বর ২০২৫)

মন্তব্যসমূহ