হঠাৎ একদল লোক বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তারা এক গর্ভবতী নারীকে টেনে-হিঁচড়ে তার পেট চিরে ফেলে। আরেক নারীর বুকের কাপড় ছিঁড়ে তাকে কাঁধে তুলে পাশের ঘরে নিয়ে যায়। চারদিকে তখন শুধু চিৎকার, আর্তনাদ আর আতঙ্ক।
এই লজ্জা, নির্যাতন আর সম্ভ্রমহানির বিভীষিকা সহ্য করতে না পেরে এক বৃদ্ধা দরজা বন্ধ করে দেন। তারপর কাঁপা হাতে নিজের পরিবারের নারীদের একে একে কাছে ডেকে গলায় ছুরি চালাতে থাকেন।
যেন শত্রুর হাতে তাদের তুলে দেওয়ার চেয়ে নিজের হাতে মৃত্যুই কম ভয়ংকর। সেই অসহায় মুহূর্তে ক্ষোভ আর হাহাকারে স্বামীকে উদ্দেশ করে তিনি শুধু বলছিলেন, 'বলেছিলাম না, আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতে!'
এই একটি দৃশ্যই আমাকে ভেঙে দিয়েছে। অঝোরে কেঁদেছি। বুকের ভেতর হুহু করে উঠেছে। এতটা নির্মম, এতটা অসহনীয় এই দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। দৃশ্যটি 'ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা' সিনেমার।
সিনেমাটিতে দেখিয়েছে, দেশভাগ শুধু মানচিত্র ভাগ করেনি, অসংখ্য পরিবার, স্বপ্ন আর জীবনকেও ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। কেউ আর শেষ পর্যন্ত নিজের মানুষগুলোর কাছে ফিরে যেতে পারেনি।
সব সিনেমা বিনোদনের জন্য তৈরি হয় না। কিছু সিনেমা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, হৃদয়ে স্থায়ী এক শূন্যতা রেখে যায়। 'ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা' তেমনই একটি সিনেমা।
সিনেমা শেষ হওয়ার পরও মনে হয়, আমরা সবাই হয়তো কোনো না কোনো কিছুর অপেক্ষায় আছি। কোনো প্রিয় মানুষের, কোনো হারিয়ে যাওয়া সময়ের, কোনো ফেলে আসা বাড়ির, কিংবা নিজেরই হারিয়ে যাওয়া একটি অংশের।
পরিচালক ইমতিয়াজ আলী আবারও প্রমাণ করেছেন, তাঁর কাছে প্রেম কেবল দুজন মানুষের সম্পর্ক নয়। প্রেম মানে শেকড়ের টান, মাটির গন্ধ, স্মৃতির ভার, পরিবার হারানোর বেদনা এবং একদিন ফিরে যাওয়ার অবিনাশী আকাঙ্ক্ষা।
আমি বলব, সিনেমাটির সবচেয়ে বড় শক্তি নাসিরুদ্দিন শাহ। তাঁর চোখের ভাষা অনেক সংলাপের চেয়েও গভীর। তাঁর নীরবতা, দীর্ঘশ্বাস, অপেক্ষা, সবকিছুই দর্শকের হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে। দিলজিৎ দোসাঞ্জ, শারভরি ওয়াঘ এবং বেদাং রায়নাও নিজেদের চরিত্রে দারুণ আন্তরিক।
আর এ আর রহমানের সুর যেন এই সিনেমার অদৃশ্য একটি চরিত্র। অনেক সময় মনে হয়েছে, সংলাপ থেমে গেলেও সুরই চরিত্রগুলোর না-বলা কান্না, ভালোবাসা আর অপেক্ষার গল্প বলে যাচ্ছে।
