সকালবেলা চা হাতে বসে রহিম সাহেব ফেসবুকে একটি পোস্ট দিলেন, 'এই দেশে দুর্নীতিবাজদের ফাঁসি হওয়া উচিত।' পোস্টটি পঞ্চাশটি লাইক পেল, বিশটি শেয়ার হলো। বিকেলবেলা সেই একই মানুষ অফিসে বসে একটি ফাইল আটকে রাখলেন, কারণ অপর পাশ থেকে খামটা এখনো আসেনি। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে নিজেকে বেশ ভালো মানুষ মনে হলো।
এই দৃশ্যটি কাল্পনিক, কিন্তু এর ভেতরের মানুষটি একেবারে বাস্তব।
আমরা একটি অদ্ভুত সময়ে বাস করছি। চারদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার মানুষের অভাব নেই। রাস্তায়, চায়ের দোকানে, সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন লাখো কণ্ঠে একই অভিযোগ ধ্বনিত হয়, সিস্টেম পচে গেছে, নেতারা চোর, দেশটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ এই একই মানুষগুলোর একটি অংশ যখন নিজেরা কোনো ক্ষমতার চেয়ারে বসেন, তখন হাত পাততে দেরি করেন না। কেউ ফাইল আটকে রাখেন, কেউ পদোন্নতির বিনিময়ে দর হাঁকেন, কেউ ঠিকাদারের কাছ থেকে কমিশন ছাড়া কাজ ছাড়েন না।
মনোবিজ্ঞানীরা এই ঘটনাটিকে বলেন নৈতিক ভণ্ডামি। তবে সেই পরিভাষার আড়ালে যে সত্যটা লুকিয়ে আছে, সেটা আরও গভীর। মানুষ মূলত খারাপ বলেই এমন করে না। বরং মানুষ নিজেকে সবসময় ন্যায়সংগত প্রমাণ করার একটি অসাধারণ ক্ষমতা রাখে। 'সবাই নেয়, আমি না নিলে কী হবে।' 'বেতন এত কম, একটু না নিলে সংসার চলে না।' 'আমি তো বড় কিছু করছি না, উপরের লোকেরা কোটি কোটি মারছে।' এই যুক্তিগুলো মিথ্যা নয় সম্পূর্ণ, কিন্তু সত্যও নয়। এগুলো হলো বিবেকের সঙ্গে আপোস করার পথ।
গবেষণা বলছে, মানুষ দুর্নীতিকে নিন্দা করে বিমূর্তভাবে, অর্থাৎ যখন সেটা অন্যের বিষয়। কিন্তু নিজে যখন সেই ক্ষমতার জায়গায় বসে, তখন পরিস্থিতির চাপ, লোভ এবং ধরা না পড়ার আত্মবিশ্বাস মিলে সিদ্ধান্তটা বদলে দেয়। আমেরিকার নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ নিজের অনৈতিক কাজকে অনৈতিক মনে করে না, কারণ নিজের উদ্দেশ্যটা সে সবসময় ভালো জানে। অন্যের ঘুষ নেওয়া দুর্নীতি, কিন্তু নিজের 'একটু সুবিধা নেওয়া' সেটা অন্য জিনিস।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দ্বিচারিতা আরও জটিল রূপ নিয়েছে। এখানে ঘুষ অনেক ক্ষেত্রে কেবল ব্যক্তির পতন নয়, এটি একটি অলিখিত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। নতুন কেউ এসে সৎ থাকতে চাইলে সহকর্মীরা তাকে বোকা ভাবেন, উপরের মহল সন্দেহের চোখে দেখেন। চাপটা কেবল বাইরে থেকে আসে না, ভেতর থেকেও আসে। যিনি এই স্রোতে ভেসে যান, তিনি কিন্তু নিজেকে দুর্নীতিবাজ ভাবেন না। তিনি মনে করেন, তিনি কেবল বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে চলছেন।
কিন্তু এই 'বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে চলা'র মধ্যেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ প্রতিটি আপোস একটি নজির তৈরি করে, পরের আপোসটা সহজ হয়ে যায়। প্রথমবার ঘুষ নিতে বুকটা কাঁপে, দ্বিতীয়বার কাঁপে না। প্রথমবার নিজেকে ন্যায়সংগত করতে কষ্ট হয়, পরের বার কষ্ট হয় না। এভাবেই একটি সমাজের বিবেক ধীরে ধীরে ভোঁতা হয়ে যায়, কোনো বড় বিস্ফোরণ ছাড়াই।
ফেসবুকের পোস্ট এখানে একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। গবেষকরা দেখেছেন, কেউ যখন প্রকাশ্যে কোনো নৈতিক অবস্থান ঘোষণা করেন, তখন তার ভেতরে একটি মানসিক তৃপ্তি তৈরি হয়। নিজেকে ভালো মনে হয়, একটি দায়িত্ব পালিত হয়েছে বলে মনে হয়। এই তৃপ্তিটাই বিপজ্জনক, কারণ এটি বাস্তব সততার বিকল্প হয়ে ওঠে। দুর্নীতিবিরোধী পোস্ট দেওয়াটাই যেন সৎ মানুষের প্রমাণ হয়ে যায়, বাস্তবে সৎ থাকার চাপটা আর অনুভব হয় না।
সমস্যাটা ব্যক্তির একার নয়, সমাজের গভীরে প্রোথিত। যে সমাজে সৎ কর্মকর্তা পদোন্নতি পান না আর চালাক কর্মকর্তা দ্রুত উপরে ওঠেন, সেখানে সততা অনেকের কাছে বোকামি মনে হয়। যে সমাজে অপরাধের শাস্তির চেয়ে ধরা পড়ার সম্ভাবনা নিয়েই মানুষ বেশি ভাবেন, সেখানে নৈতিকতার হিসাব বদলে যায়। কিন্তু এই যুক্তিকে সম্পূর্ণ মেনে নিলে পরিবর্তনের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।
আসল প্রশ্নটা হলো, আমরা কি সত্যিই দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চাই, নাকি কেবল চাই যে অন্যরা দুর্নীতি না করুক? দুটির মধ্যে পার্থক্যটা বিশাল। প্রথমটির মানে হলো নিজেকে বদলানো, দ্বিতীয়টির মানে হলো পোস্ট দিয়ে ঘুমানো।
পরিবর্তন কখনো উপর থেকে নামে না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে সমাজগুলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকারের লড়াই করেছে, সেখানে ব্যক্তির দৈনন্দিন ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলো আগে বদলেছে। একটি ফাইল আটকে না রাখা, খামের দিকে হাত না বাড়ানো, ক্ষমতার সুযোগ থাকলেও না নেওয়া, এই কাজগুলো বীরত্বের মতো দেখতে না হলেও এগুলোই আসলে বড় বিপ্লবের ভিত্তি।
কাজেই পরের বার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিছু লেখার আগে একটিবার আয়নার সামনে দাঁড়ান। যাকে আপনি দেখতে পাচ্ছেন, সেই মানুষটি কি সেই পোস্টের যোগ্য? হয়তো উত্তরটা অস্বস্তিকর। কিন্তু অস্বস্তিটুকুই পরিবর্তনের শুরু।
