সেদিন রাত তিনটা। তানভীরের বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত ভার জমে ছিল, যেটাকে ঠিক কষ্ট বলা যায় না, আবার স্বস্তিও বলা যায় না। বাবা হাসপাতালে ভর্তি, পাশে থাকার মতো কেউ নেই, হাতে টাকাও কম। তিনি ফোনটা হাতে নিলেন। বন্ধু তালিকায় চার হাজার তিনশোরও বেশি নাম। প্রতিদিন তাদের অনেকেই তার ছবিতে লাইক দেয়, মন্তব্য করে, জন্মদিনে শুভেচ্ছা পাঠায়। তিনি একে একে কয়েকজনকে বার্তা পাঠালেন। কেউ জবাব দিল না। একজন পড়ল, কিন্তু উত্তর করল না। আরেকজন লিখল, 'ভাই, এখন একটু ব্যস্ত আছি।' তানভীর ফোনটা রেখে দিলেন। অন্ধকার ঘরে একা বসে রইলেন।
এই অভিজ্ঞতাটি এখন আর কোনো একজনের একক গল্প নয়। এটি একটি প্রজন্মের সাধারণ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে। যে প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি 'সংযুক্ত', তারাই সবচেয়ে বেশি একা। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে এখন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা পাঁচ কোটি ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা কাটায় এই জগতে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এখন বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিষয়টা একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায়, ভার্চুয়াল সম্পর্ক আসলে কী। কেউ একটি ছবি দিল। আপনি পছন্দ জানালেন। সে আপনার পছন্দ দেখে খুশি হলো। এই লেনদেনটি সম্পন্ন হলো মাত্র এক সেকেন্ডে। এর ভেতরে কোনো মনোযোগ নেই, কোনো উপস্থিতি নেই, কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এই যে পারস্পরিক স্বীকৃতির খেলা, এটি আমাদের মস্তিষ্ককে কিছুটা ভালো লাগার অনুভূতি দেয়। কিন্তু এই ভালো লাগাটা ক্ষণস্থায়ী এবং অগভীর। এটি প্রকৃত সম্পর্কের অনুভূতি নয়, বরং তার একটি হালকা অনুকরণ মাত্র।
প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সময়ের ভেতরে। একসঙ্গে কঠিন মুহূর্ত পার করলে, একে অপরের দুর্বলতা দেখলে, কোনো সুবিধা ছাড়াই পাশে থাকলে। এই প্রক্রিয়াটি ধীর, অনেক সময় কঠিন এবং পরিশ্রমসাধ্য। ভার্চুয়াল জগতের গতি এই ধীরতার সঙ্গে মেলে না। এখানে সবকিছু তাৎক্ষণিক। মনোযোগ তাৎক্ষণিক, সংযোগ তাৎক্ষণিক, বিচ্ছেদও তাৎক্ষণিক। একটি 'আনফ্রেন্ড' বা 'ব্লক' বোতামে একটি সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, কোনো আলোচনা ছাড়াই, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই।
মনোবিজ্ঞানীরা এই প্রবণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন। সামাজিক মাধ্যম আমাদের একটি বিশেষ ধরনের উপস্থাপনায় অভ্যস্ত করে তোলে, যেখানে সবাই নিজের সেরা সংস্করণটি দেখায়। আনন্দের ছবি, সাফল্যের খবর, ভ্রমণের গল্প। কষ্ট লুকানো হয়, ব্যর্থতা এড়িয়ে যাওয়া হয়, দুর্বলতা প্রকাশ করা হয় না। ফলে যে সম্পর্কগুলো তৈরি হয়, সেগুলো আসলে দুটি 'সেরা সংস্করণে'র মধ্যে সম্পর্ক। বাস্তব মানুষটির সঙ্গে নয়। তাই বিপদের দিনে, যখন প্রকৃত মানুষটির প্রয়োজন হয়, তখন সেই সম্পর্ক টিকতে পারে না।
এই প্রসঙ্গে একটি গবেষণার কথা বলা দরকার। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী রবিন ডানবার বহু বছর ধরে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, একজন মানুষ গড়ে মাত্র পাঁচজনের সঙ্গে প্রকৃত অর্থে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে পারেন। পনেরো জন পর্যন্ত থাকতে পারে বিশ্বস্ত বন্ধুর দল। তার বাইরে সবাই পরিচিত, কিন্তু সেই পরিচয়ের গভীরতা থাকে না। ভার্চুয়াল জগতে হাজার বন্ধুর ধারণাটি এই স্বাভাবিক মানবিক সীমাকে উপেক্ষা করে। কিন্তু সংখ্যা বাড়লেই গভীরতা বাড়ে না।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই সমস্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। তারা স্বীকৃতির জন্য অনলাইনের দিকে তাকায়। কতটি পছন্দ পেল, কতজন মন্তব্য করল, কতটি ভাগ হলো, এই সংখ্যাগুলো দিয়ে তারা নিজেদের মূল্য নির্ধারণ করতে শুরু করে। যখন সংখ্যা কম আসে, মনে হয় নিজেকে কেউ পছন্দ করে না। যখন বেশি আসে, সাময়িক ভালো লাগে, কিন্তু সেই ভালো লাগা টেকসই নয়। এই চক্রের মধ্যে আটকা পড়ে অনেক তরুণ উদ্বেগ ও হতাশায় ভুগছেন, যদিও তাদের বন্ধু তালিকায় শত শত নাম।
একটি প্রশ্ন মাথায় আসে, ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব কি তাহলে সম্পূর্ণ মূল্যহীন? উত্তরটা সহজ নয়। অনলাইনে পরিচয় হয়ে পরে বাস্তবে গভীর সম্পর্ক তৈরির উদাহরণও কম নেই। দূরে থাকা পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে এই মাধ্যম অনেক কাজে আসে। কোনো বিশেষ আগ্রহের সম্প্রদায়ে যুক্ত হয়ে মানুষ নতুন অর্থবহ সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন। কিন্তু সমস্যা হয় যখন ভার্চুয়াল সম্পর্ককেই মূল সম্পর্ক মনে করা হয়। যখন বাস্তব মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে মানুষ স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে থাকে।
বাস্তব সম্পর্কে বিনিয়োগ করতে হয়। সময় দিতে হয়, শ্রম দিতে হয়, মনোযোগ দিতে হয়। বিপদে পাশে যেতে হয়, অসুবিধে হলেও ফোন ধরতে হয়, কখনো নিজের স্বার্থ ছেড়ে অন্যের কথা ভাবতে হয়। এই বিনিয়োগটুকুই সম্পর্ককে টেকসই করে। কিন্তু সহজ বিকল্পের অভ্যাস হয়ে গেলে এই কঠিন পথটা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তানভীরের গল্পে ফিরে আসি। সেই রাতে তার চার হাজার তিনশো বন্ধু ঘুমিয়ে ছিল বা ব্যস্ত ছিল বা অজ্ঞাত কারণে সাড়া দেয়নি। কিন্তু ভোর হতেই তার পাড়ার মুদি দোকানের জামাল ভাই এসে জিজ্ঞেস করলেন, 'তানভীর, আপনার বাবা নাকি হাসপাতালে? কোনো সাহায্য লাগবে?' জামাল ভাই তার অনলাইন বন্ধু নন। তার ছবিতে কখনো লাইক দেননি। কিন্তু পাশে ছিলেন।
এই পার্থক্যটুকু বোঝার ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে আসল উত্তর। পর্দার আলোয় হাজার মুখ দেখা যায়, কিন্তু অন্ধকারে যে হাতটি এগিয়ে আসে, সেটাই আসল। সেই হাতটি গড়তে হয় সময় দিয়ে, সামনে বসে, চোখে চোখ রেখে। এই সত্যটি প্রযুক্তি বদলে দিতে পারেনি, হয়তো কখনো পারবেও না।
