বুদ্ধিজীবী কারা ও তাদের কাজ কী?
সমাজের বিভিন্ন স্তরে আমরা 'বুদ্ধিজীবী' শব্দটি প্রায়ই শুনে থাকি। কিন্তু বুদ্ধিজীবী কারা? তাদের ভূমিকা কী? কেন তারা একটি সমাজ বা জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের বুদ্ধিজীবী শব্দটির প্রকৃতি ও তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।
বুদ্ধিজীবী কারা?
বুদ্ধিজীবী হলো এমন একদল মানুষ, যারা বুদ্ধি, জ্ঞান এবং সৃজনশীলতার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করেন এবং তার সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। তারা সাধারণত সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং নৈতিকতার উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
দার্শনিক, লেখক, অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, শিল্পী এবং সমাজকর্মী—এই শ্রেণির মানুষদের সাধারণত বুদ্ধিজীবী বলা হয়ে থাকে। তবে বুদ্ধিজীবী হওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট পেশায় কাজ করতে হবে, এমন নয়। বুদ্ধিজীবী হওয়ার মূল মাপকাঠি হলো সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নিজস্ব চিন্তাভাবনার মাধ্যমে সমাজের মঙ্গল করার চেষ্টা।
বুদ্ধিজীবীদের কাজ কী?
বুদ্ধিজীবীদের কাজ বহুমুখী। তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো সমাজের জন্য চিন্তা করা, জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন অসঙ্গতি দূর করার প্রচেষ্টা চালানো। নিচে বুদ্ধিজীবীদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ তুলে ধরা হলো:
জ্ঞান ও গবেষণার বিস্তার: বুদ্ধিজীবীরা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও তার বিস্তারে কাজ করেন। বিজ্ঞানীরা নতুন আবিষ্কারে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যান, লেখকরা মানুষের মনে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করেন আর অধ্যাপকরা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করেন।
সমাজের সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধান: সমাজের কোথায় কোন সমস্যা রয়েছে, তা বুদ্ধিজীবীরাই প্রথম চিহ্নিত করেন। তারা এসব সমস্যা নিয়ে বিশ্লেষণ করেন এবং সমাধানের দিক নির্দেশনা দেন। যেমন, দারিদ্র্য, বৈষম্য, পরিবেশদূষণ বা নারী অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে তাদের গবেষণা ও মতামত সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।
গণজাগরণ সৃষ্টি: বুদ্ধিজীবীরা সাধারণত মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন লেখালেখি, বক্তৃতা বা আন্দোলনের মাধ্যমে তারা মানুষের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন।
নৈতিক ও ন্যায্যতার রক্ষক: বুদ্ধিজীবীরা নৈতিকতার মাপকাঠি ধরে রাখেন এবং অন্যায়, দুর্নীতি বা বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। তারা কেবল সমালোচনা করেন না; বরং সঠিক দিকনির্দেশনাও দেন।
সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে পরামর্শ প্রদান: রাষ্ট্র বা সমাজের নীতিনির্ধারণে বুদ্ধিজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। তারা ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির ওপর গবেষণা করে উন্নয়নের জন্য কার্যকর পরামর্শ দেন।
বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
একটি জাতি তখনই উন্নত হতে পারে, যখন সেখানে জ্ঞানী ও সৃষ্টিশীল মানুষের সমন্বয় থাকে। বুদ্ধিজীবীরা সমাজের আয়না হিসেবে কাজ করেন, যেখানে সমাজের ভালো-মন্দ উভয় দিক প্রতিফলিত হয়। তারা বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে মতামত দেন, যা সমাজকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।
তবে বুদ্ধিজীবীদের কাজ সবসময় সহজ নয়। তারা কখনো কখনো সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলেন, সমাজের প্রচলিত ধ্যানধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। এতে তারা সমালোচনার শিকার হন, কখনো কখনো নিপীড়নের মুখেও পড়েন। তবুও তাদের সাহসিকতা এবং দায়িত্ববোধ একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা
বাংলাদেশের ইতিহাসে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় তারা দেশের মানুষকে সংগঠিত করেছেন এবং মুক্তির দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল, কারণ তারা জানত, একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো এর বুদ্ধিজীবী সমাজ। আজও দেশের উন্নয়ন, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশে বুদ্ধিজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
শেষ কথা
বুদ্ধিজীবীরা একটি জাতির পথপ্রদর্শক। তাদের চিন্তা, কাজ এবং সাহসিকতা জাতিকে গড়ে তোলে এবং এগিয়ে নিয়ে যায়। তবে সমাজের প্রতিটি স্তরে বুদ্ধিজীবীদের মূল্যায়ন করতে হবে এবং তাদের কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বুদ্ধিজীবী মানে কেবল উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি নয়; বরং এমন মানুষ, যারা জাতির প্রতি নিবেদিত এবং সমাজের জন্য চিন্তা করেন।
(কালের কণ্ঠ । ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪)
মন্তব্যসমূহ