নিরাপত্তা যাদের হাতে, তারা কি সত্যিই সেই দায়িত্বের উপযুক্ত?
রাস্তাঘাটে হাঁটতে হাঁটতে কিংবা বাসা থেকে বেরিয়ে একটু আশপাশে তাকালেই চোখে পড়ে—দারোয়ান, সিকিউরিটি গার্ড, নাইট গার্ড কিংবা কেয়ারটেকাররা নিজ নিজ দায়িত্বে নিযুক্ত। কিন্তু একবার কি খেয়াল করে দেখেছি, তাদের অবস্থা কেমন? অনেকের বয়স বেশি, কেউ সোজা হয়ে হাঁটতেও পারেন না; কারো মুখে অসুস্থতার ছাপ, কেউ মোবাইলের পর্দায় ডুবে থাকেন, আবার কাউকে তো খুঁজেই পাওয়া যায় না। অথচ, এই মানুষগুলোর হাতেই আমরা তুলে দিচ্ছি আমাদের বাসা, অফিস, শপিং মল, এমনকি এটিএম বুথের নিরাপত্তা!
প্রশ্ন জাগে—এই দায়িত্বে যারা আছেন বা যাদের সরবরাহ করছে যে সিকিউরিটি কোম্পানিগুলো, তারা কি আসলেই যোগ্যতা যাচাই করে নিয়োগ দিচ্ছে? একজন নিরাপত্তাকর্মীর শরীরচর্চা, চেতনা, সতর্কতা—এই সবই তো জরুরি। বয়স কত হলে তিনি উপযুক্ত হবেন, শারীরিক ও মানসিকভাবে কতটা ফিট হতে হবে—এসব নিয়ে আমরা কখনো কি সিরিয়াসলি ভেবেছি?
হ্যাঁ, ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। অনেক গার্ড আছেন, যারা অত্যন্ত সচেতন, চৌকস, দায়িত্ববান। এমনকি অনেকের কথাবার্তায়, চালচলনে পেশাদারিত্বের ছাপ স্পষ্ট। তাদের দেখে স্বস্তি মেলে, আস্থাও জন্মায়। কিন্তু প্রশ্নটা পুরো পেশাটিকে ঘিরে—এই জায়গায় অধিকাংশ সময় যারা আসছেন, তারা আসলে কারা?
আমরা অনেক সময় নিজের এলাকার কোনো দরিদ্র, বয়স্ক মুরুব্বিকে সহানুভূতি করে নাইট গার্ডের দায়িত্ব দিয়ে দিই।
কোনো অ্যাপার্টমেন্টের ম্যানেজমেন্টে থেকে নিজের পরিচিত, চাকরি হারানো কাউকে কেয়ারটেকার বানিয়ে ফেলি। মানবিক দিক থেকে এটি প্রশংসনীয়, নিঃসন্দেহে। কিন্তু একইসাথে এটি একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্তও। কারণ, আপনি এক ব্যক্তিকে সাহায্য করছেন ঠিকই, কিন্তু একইসাথে পুরো ভবন বা মহল্লার নিরাপত্তাকে বিপন্ন করছেন না তো?
বাসার দরজায় তালা লাগানোর পর আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চাই, অফিসে গিয়ে চাই বাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে না হোক। এটিএম বুথে টাকা রেখে নিশ্চিন্ত থাকতে চাই। কিন্তু যাদের হাতে এই দায়িত্ব তুলে দিচ্ছি, তারা যদি নিজেরাই নিরাপত্তাহীন অবস্থায় থাকেন—তবে সে নিশ্চিন্তি আসে কোথা থেকে?
নিরাপত্তা একটি গুরুতর বিষয়। এই পেশাটিকে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। সিকিউরিটি গার্ড, দারোয়ান বা কেয়ারটেকার—এই শব্দগুলো যেন কেবল সহানুভূতির জায়গা থেকে নয়, দক্ষতা ও দায়িত্বের জায়গা থেকেই বিবেচিত হয়। সঠিক প্রশিক্ষণ, বয়সসীমা, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক স্থিতি—এসব বিষয় বিবেচনায় এনে যেন এই পেশায় নিয়োগ হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে এই পেশার জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণ করা দরকার। পাশাপাশি, তাদের বেতন-সুবিধা বাড়িয়ে এই চাকরিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে, যাতে দক্ষ ও সক্ষম মানুষ এগিয়ে আসেন।
কারণ, নিরাপত্তা যাদের হাতে, তাদের ফিটনেসের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের ঘুম, আমাদের শিশুর নিরাপত্তা, আমাদের সম্পদ—সবকিছুই যে তাদের সতর্ক চোখে নির্ভর করে। তাই প্রশ্নটা এখনই তোলা দরকার—নিরাপত্তা যাদের হাতে, তারা কি সত্যিই সেই দায়িত্বের উপযুক্ত?
(কালের কণ্ঠ । ১৪ জুন ২০২৫)
মন্তব্যসমূহ