চোখ দিয়েও হয়রানি হয়—এই নীরব সহিংসতা বন্ধ হোক

 

রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পাশে আপনার স্ত্রী, কিংবা ভাগ্নি। এমন মুহূর্তে আশপাশে কিছু চোখ হঠাৎ যেন বিষাক্ত হয়ে ওঠে। তাদের দৃষ্টির তীব্রতা যেন শরীর চিরে ভেতরে ঢুকে যেতে চায়। কিছু বলছে না, টিটকারিও করছে না, তবু তীক্ষ্ণ সে চাহনি। চোখ দিয়েই যেন চলতে থাকে এক ধরনের নীরব নির্যাতন, যা অনেক সময় কথার চেয়ে বেশি কষ্টদায়ক।

এটা ‘ইভ টিজিং’ নয়, এটি তারও এক ধাপ নিচু সংস্করণ। গা ঘিনঘিনে এক আচরণ, যেখানে কেউ প্রকাশ্যে কোনো কিছু না বলেই নারীর শরীর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চোখ দিয়ে দেখে যায়। যেন মন থেকে নয়, শুধু শরীরটাই দেখে। এরা দাঁড়িয়ে থাকে দোকানের পাশে, রাস্তার কোনায়, শপিং মলে কিংবা বাসস্ট্যান্ডে। এমনকি অনেক সময় পেছন ফিরে তাকানোরও প্রয়োজন হয় না—এদের চোখের দৃষ্টি যেন পেরিয়ে যায় পর্দার ভেতরও।

ভয়াবহ হলো, এই আচরণে শুধু তরুণ ছেলেরাই নয়, অনেক মধ্যবয়সী কিংবা বৃদ্ধ পুরুষকেও দেখা যায় একই কায়দায় অংশ নিতে। যেন চোখ দিয়েই সব মাপতে চায়। এমনভাবে তাকায় যে মনে হয় এখনই ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে। এটাকেই তারা ‘আনন্দ’ বলে, অথবা হয়তো নিজের ব্যর্থতা ঢাকার এক ধরনের বিকৃত প্রয়াস। কিন্তু তারা বোঝে না, এই বিকৃত আনন্দে একজন নারী প্রতিনিয়ত সংকুচিত হয়ে পড়েন। তার চলাফেরা, পোশাক, আত্মবিশ্বাস—সব কিছুর ওপর চাপ পড়ে।

নারীর জন্য বাইরের পৃথিবী এমনিতেই সহজ নয়। তার ওপর যদি প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে এই ‘চোখের অত্যাচার’ সহ্য করতে হয়, তাহলে তার নিরাপত্তাবোধ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এমন না যে সব সময় কেউ প্রতিবাদ করতে পারে। কারণ এসব দৃষ্টিকে হাতেনাতে ধরা যায় না, আর যারা এমন করে, তারা খুব ভালো করেই জানে কিভাবে অদৃশ্য থেকে বিরক্তি ছড়াতে হয়।

সমাধান কেবল আইন দিয়ে হবে না। এর শিকড় অনেক গভীরে—পারিবারিক শিক্ষায়, সামাজিক মননে, বন্ধু-বান্ধবের আলাপে। ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে, নারী ভোগের বস্তু নয়। তার শরীর নয়, তার সম্মান দেখো। তাকে দেখো একজন মানুষ হিসেবে। তাকে ভয় নয়, নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।

চোখ দিয়ে কেউ কাউকে খেয়ে ফেলতে পারে না—এই কথাটি যেমন সত্য নয়, তেমনি এটাও সত্য নয় যে, চোখ দিয়ে নির্যাতন হয় না। হয়, প্রতিনিয়ত হয়। আর যতক্ষণ না আমরা সবাই এ কথা স্বীকার করে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াব, ততক্ষণ নারী নিরাপদ হবে না। কারণ নির্যাতনের প্রথম ধাপটা হয় দৃষ্টিতে। আর সেটাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।

এই অবহেলা বন্ধ হোক। শুধু আইন দিয়ে নয়, প্রয়োজন শিক্ষা, সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ। প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি বন্ধু-বান্ধবের আড্ডাও হতে পারে এই পরিবর্তনের সূতিকাগার। আমাদের চোখ যেন সম্মানের আয়না হয়ে ওঠে, অবমাননার অস্ত্র নয়। 

মনে রাখতে হবে, কেউ কিছু বলছে না মানেই কেউ কষ্ট পাচ্ছে না—এমনটা নয়। চোখ দিয়েও মানুষকে কষ্ট দেওয়া যায়, আতঙ্কে ফেলা যায়। এই নীরব সহিংসতার অবসান ঘটিয়ে একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ সমাজ গড়তে হলে আজই শুরু হোক পরিবর্তনের যাত্রা।

(কালের কণ্ঠ । ১৮ জুন ২০২৫)

মন্তব্যসমূহ