মাদকের ছোবলে যুবসমাজ, দায় এড়াতে পারে না কেউ
মাদক এখন শুধু একটি সামাজিক ব্যাধি নয়, বরং এটি পরিণত হয়েছে জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংসের অন্যতম প্রধান অস্ত্রে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের দায়িত্বে শিথিলতা, কখনো বা সরাসরি অসাধু মাদকচক্রে জড়িয়ে পড়া-এসব কারণেই মাদক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। ভয়াবহভাবে বিস্তার ঘটেছে এই মরণ নেশার। রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল-মাদকের নাগাল এখন সর্বত্র।
হাত বাড়ালেই মেলে ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা, আইস, এলএসডি, ডিএমটি কিংবা আরও ভয়ঙ্কর সব নেশা। শুধু সশরীরে নয়, অনলাইন মাধ্যমেও চলছে মাদকের জমজমাট কারবার।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ইতোমধ্যেই কোটি ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, এই সিংহভাগ মাদকসেবীই তরুণ।
একসময় স্কুল-কলেজের ছাত্ররা মাদকে জড়ানোর খবর শোনা যেত। কিন্তু এখন ছাত্রীরাও এই নেশার ফাঁদে আটকা পড়ছে। নেশা যেন খুব সহজেই বন্ধুতা, কৌতূহল কিংবা হতাশার হাত ধরে প্রবেশ করছে শিক্ষার্থীদের জীবনে। তাদের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ, সম্ভাবনা সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে এই মরণ নেশা।
আজ কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ‘মাদকের আগ্রাসন বাড়ছে’ শিরোনামের সংবাদটি পড়ার পর পুরো হতভম্ব হয়ে যেতে হয়। সেখানে বলা হয়েছে, মাদক কারবারে জড়িত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা। আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে ৮৫ জন গডফাদারসহ এক হাজার ২৩০ জন মাদক কারবারির পুরনো তালিকা রয়েছে। সেই তালিকা হালনাগাদের কাজও চলছে। তাহলে চিন্তা করে দেখুন, মাদকের শিকড় কতটা গভীরে প্রবেশ করেছে আমাদের সমাজে!
মাদক ব্যবসার সঙ্গে শুধু অপরাধীচক্রই নয়, জড়িত রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কিছু অসাধু সাংবাদিক, এমনকি নানা পেশার প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও।
যারা হওয়ার কথা ছিল সমাজের অভিভাবক, তারা আজ পরিণত হয়েছে মাদকের গডফাদারে। ফলে মাদক নির্মূল অভিযান থেমে যাচ্ছে মাঝপথে। অনেকে ধরাও পড়ছে না। আবার যারা ধরা পড়ছে, তারাও আইনের ফাঁকফোকর গলে বের হয়ে যাচ্ছে অনায়াসে।
মাদকের ভয়াবহতা শুধু ব্যক্তিগত জীবনকেই বিপর্যস্ত করছে না, এটি সামাজিক অবক্ষয়কেও ত্বরান্বিত করছে। বাড়ছে অপরাধ, পারিবারিক অশান্তি, আত্মহত্যা ও সহিংসতা। তরুণ সমাজ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে দ্রুত। অথচ এই তরুণরাই তো দেশের মূল শক্তি, আগামী দিনের নেতৃত্ব।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে হতে হবে আরও সক্রিয়। মাদকের বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন। নইলে অচিরেই পুরো জাতি এই মরণ নেশার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।
(কালের কণ্ঠ । ২৬ জুন ২০২৫)
মন্তব্যসমূহ