বিমানের চাকা চুরি—নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতায় ভয়াবহ প্রশ্ন


সিলেটের সাদা পাথর চুরির ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে, আরেকটি চুরির ঘটনা গণমাধ্যমে সামনে এসেছে— বিমানের চাকা চুরি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো একটি অতি সংবেদনশীল স্থানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১০টি চাকা চুরি হওয়ার খবর নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। বিষয়টি এতটাই অস্বাভাবিক যে প্রথমে শুনে বিশ্বাস করাও কঠিন। এমন কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে থেকেও কিভাবে এ ধরনের চুরি সম্ভব হলো, তা সত্যিই কল্পনাতীত।

আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিমান কর্তৃপক্ষের দাবি— চোরচক্র এসব চাকা চুরি করে বেসরকারি কোনো এয়ারলাইনসে বিক্রি করছে। ভাবুন তো, একটি বা দুটি নয়, পুরো ১০টি চাকা উধাও হয়ে গেল! এত বড় আকারের মালামাল সরানো কোনোভাবেই সহজ কাজ নয়। তবুও কাউকে ধরা যায়নি। এটি প্রমাণ করে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেতর থেকে কতটা দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে আছে।

এখানে আরো একটি দিক খেয়াল করার মতো। থানায় করা জিডিতে সরাসরি ‘চুরি’র অভিযোগ আনা হয়নি, বরং লেখা হয়েছে চাকাগুলো ‘খুঁজে পাওয়া যায়নি’। জিডিতে বলা হয়েছে, চাকা না পাওয়ায় বিমানের সংশ্লিষ্ট দুজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা জানান, চাকাগুলো একটি বেসরকারি এয়ারলাইনসকে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, চুরির কোনো ঘটনা নয়— একজন আরেকজনকে চাকাগুলো ব্যবহার করতে দিয়েছে।

তাই মনে হচ্ছে, বিমান কর্তৃপক্ষ নিজেরাই ঘটনাটিকে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করছে। চাকাগুলোর দাম শুনলেও চমকে উঠতে হয়। কালের কণ্ঠের খবরে বলা হয়েছে, একটি বিমানের চাকার মূল্য ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত। সেই হিসাবে ১০টি চাকার দাম দাঁড়ায় প্রায় কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের সম্পদ এভাবে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে দেশের ভাবমূর্তির জন্যও বড় ধাক্কা।

বিমানের একের পর এক এই ঘটনাগুলো দেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনসের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। তাই চাকা ‘চুরি’ ঘটনার একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরো বাড়বে।

এ ধরনের ঘটনা দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্যও বড় হুমকি। কারণ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেপিআইভুক্ত স্থাপনাগুলোর একটি। কেপিআই হিসেবে এসব স্থাপনার নিরাপত্তা বিধানের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে। এর জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা এসওপিও রয়েছে।

জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কেপিআইয়ের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৭ সালে ‘ইনস্ট্রাকশন ফর সিকিউরিটি অব কেপিআই ইন বাংলাদেশ’ তৈরি করা হয়। পরে তা হালনাগাদ করে ২০১৩ সালে বাংলা ভাষায় কেপিআই নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। বর্তমানে দেশে প্রায় ছয় শতাধিক কেপিআইভুক্ত স্থাপনা রয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, এসব স্থাপনায় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এতসব নির্দেশনা ও নিয়ম থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেপিআইভুক্ত স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তায় এখনো নানা ত্রুটি রয়েছে। বিমানবন্দরের মতো জায়গায় যদি কোটি টাকার সম্পদ চুরি হয়ে যায় এবং কেউ ধরা না পড়ে, তবে তা শুধু বিমানের নয়, পুরো দেশের নিরাপত্তার জন্যই ভয়াবহ বার্তা বহন করে।

এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, এই চুরির ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা। কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন দুঃসাহস দেখাতে পারবে না। দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে এটাই হতে পারে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।

(কালের কণ্ঠ । ২২ আগস্ট ২০২৫)

মন্তব্যসমূহ