সত্যের সৈনিকদের রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশ


গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে গাজীপুরের একটি গলিতে ধারালো অস্ত্রের ঝনঝনানি। সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনের শেষ চিৎকার আকাশে মিলিয়ে যায়। কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাকে উপর্যুপরি কুপিয়ে, জবাই করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

গত বছর দীপ্ত টিভির তানজিল জাহান তামিম, ময়মনসিংহের স্বপন কুমার ভদ্র কিংবা ঢাকার রাহনুমা সারাহ-সবাই একই পরিণতির শিকার। সত্য বলার অপরাধে তাদের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিকরা আজ চরম বিপদে। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি উন্মোচন করতে গিয়ে তাদের পদে পদে বাধার মুখে পড়তে হয়। কখনো হুমকি, কখনো মামলা, আবার কখনো রক্তাক্ত হামলা। 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্য বলছে, মাত্র এক বছরে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৭৪ জন শারীরিক হামলায় আহত হয়েছেন, চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু সংখ্যাগুলো শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নেই-প্রতিটি ঘটনার পিছনে আছে একেকটি পরিবারের অবর্ণনীয় বেদনা, একেকটি সমাজের নিষ্পেষিত কণ্ঠস্বর।

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা শুধু সন্ত্রাসীদের হুমকিই পান না, অনেক সময় রাষ্ট্রযন্ত্রের রোষানলেও পড়েন। পুলিশ কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির খবর প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে তলব করা হয়, হয়রানির শিকার হতে হয়। এমনকি আইনের অপব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর আইনও ব্যবহার করা হয় সত্যিকারের সাংবাদিকতাকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে। গত কয়েক মাসে এই আইনে অন্তত ১৬টি মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন ১২ জন সাংবাদিক।

নারী সাংবাদিকদের জন্য পরিস্থিতি আরও বেশি ভয়ঙ্কর। গত মার্চে এক নারী সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে নারী সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কতটা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েন। তাদের জন্য শুধু সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জই নয়, যুক্ত হয় নারী হিসেবে নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ বাস্তবতা।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য আরও ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানাচ্ছে, গত ছয় মাসে ২০ জন সাংবাদিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন, ৩৪ জনকে হুমকি দেওয়া হয়েছে, ১০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। অধিকারের প্রতিবেদন বলছে, ৯৫ জন সাংবাদিক শারীরিক হামলায় আহত হয়েছেন, ২২ জনকে হুমকি দেওয়া হয়েছে, ১১ জনকে মামলার আসামি বানানো হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এই নৃশংসতা? কেন সাংবাদিকদের এতটা ঝুঁকি নিতে হয়? কারণ খুবই সহজ-তারা সত্য বলছেন। তারা ক্ষমতার কুঠুরিতে জমে থাকা ময়লা উল্টেপাল্টে দেখাচ্ছেন। আর এই সত্য বলার সাহসই তাদের জন্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

একটি দেশ তখনই প্রকৃত গণতান্ত্রিক হয়, যখন সেখানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেই স্বাধীনতা আজ হুমকির মুখে। সাংবাদিকরা যদি ভয় পেয়ে সত্য বলা বন্ধ করে দেন, তাহলে সমাজের অসঙ্গতি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস-সবই অন্ধকারে ঢেকে যাবে। তখন সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরও স্তব্ধ হয়ে যাবে।

সাংবাদিকদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে এই দেশের মাটি। তাদের মৃত্যু শুধু একটি পেশারই ক্ষতি নয়, এটি গণতন্ত্রের মৃত্যুকেও ইঙ্গিত করে। সত্যের সৈনিকদের রক্ষা করতে না পারলে একদিন আমরা সবাই নিঃশব্দে হারিয়ে যাব অন্ধকারের গহ্বরে।

(কালের কণ্ঠ । ০৯ আগস্ট ২০২৫)

মন্তব্যসমূহ