বাস্তবতার বাইরে ক্যামেরা, বিশ্বাসের বাইরে গল্প
একটা ভিডিও দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। শুটিং চলছে। শর্টফিল্ম না সিনেমা, সেটা বড় কথা নয়। সমস্যা হলো যা দেখলাম, তাতে নির্মাণজ্ঞান আর বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া কঠিন। একজন নারীকে ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে। গলায় রশি। সেই রশি বাঁধা পার্কের বাচ্চাদের দোলনার খুঁটিতে। চারপাশে খোলা মাঠ, গাছগাছালি।
দেখেই বোঝা যায় এটি একটি পার্ক। মুহূর্তেই প্রশ্ন জাগে, এভাবে কি ফাঁসি হয়। খোলা মাঠে, পার্কে, দোলনার খুঁটিতে। এখানে সমস্যাটা শুধু দৃশ্যের অযৌক্তিকতা নয়। সমস্যা হলো নির্মাতার দায়িত্ববোধ। সিনেমা, নাটক বা শর্টফিল্ম কল্পনার জায়গা হলেও সেটি পুরোপুরি বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। বাস্তবতার সঙ্গে ন্যূনতম যোগ না থাকলে দর্শক বিশ্বাস হারায়। বিশ্বাস হারালে গল্প ভেঙে পড়ে। তখন অভিনয়, ক্যামেরা বা সংলাপ কিছুই আর কাজ করে না।
ফাঁসি একটি রাষ্ট্রীয় আইনি প্রক্রিয়া। এর একটি নির্দিষ্ট কাঠামো আছে, নির্দিষ্ট পরিবেশ আছে। সেটিকে পার্কের দোলনার সঙ্গে ঝুলিয়ে দেখানো মানে শুধু ভুল তথ্য দেওয়া নয়, দর্শকের বুদ্ধিকেও অবমূল্যায়ন করা। যারা এসব বানাচ্ছেন, তাদের কাছে অনুরোধ একটাই। একটু পড়ুন, একটু জানুন, একটু চর্চা করুন। বাস্তবতা কিভাবে পর্দায় তুলে ধরতে হয়, সেটার ন্যূনতম ধারণা থাকলেই অনেক ভুল এড়ানো যায়।
একসময় আমাদের সিনেমার দিকে তাকিয়ে উত্তেজনা কাজ করত। শহীদুল ইসলাম খোকনের নাম এলেই মনে হতো কিছু একটা দেখব। গল্পে টান থাকবে, দৃশ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে। এখনো দুই একজন ভালো কাজ করছেন, সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সামগ্রিকভাবে মান কেন কমছে, সেটাই প্রশ্ন। প্রযুক্তি সহজ হয়েছে, ক্যামেরা সস্তা হয়েছে, প্ল্যাটফর্ম বেড়েছে। তবু কেন আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
সম্ভবত কারণটা এখানেই। বানানো সহজ হয়েছে, শেখা কঠিন মনে হচ্ছে। দ্রুত কিছু বানিয়ে ফেলাই যেন লক্ষ্য। কিন্তু সিনেমা তাড়াহুড়ার শিল্প নয়। এটি ধৈর্যের, গবেষণার, দায়িত্বের কাজ। দর্শক শুধু দৃশ্য দেখে না, সে বিশ্বাস করতে চায়। সেই বিশ্বাস ভাঙলে সে আর অপেক্ষা করে না।
একসময় খোকনের সিনেমার জন্য অধীর আগ্রহে বসে থাকতাম। এখন সেই অপেক্ষা আর আসে না। কারণ বিশ্বাসের জায়গাটা নড়বড়ে হয়ে গেছে। নির্মাতারা যদি বাস্তবতাকে সম্মান না করেন, দর্শকও আর নির্মাণকে সম্মান করবে না। গল্প বলার স্বাধীনতা থাকুক, কিন্তু সেই গল্প যেন দর্শকের চোখে ধুলো না দেয়। বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়েই কল্পনার আকাশ ছোঁয়া যায়।
(কালের কণ্ঠ । ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫)
মন্তব্যসমূহ