খালেদা জিয়ার বক্তব্যে সাহস, সংগ্রাম ও দেশপ্রেমের শিক্ষা

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থান ছিল অনন্য। চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশ ও জনগণের জন্য তাঁর সংগ্রাম, সাহস ও ধৈর্য আমাদের জন্য জীবন্ত শিক্ষা হয়ে থাকবে। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর কথা এখনও আমাদের মনোবল, সংকল্প ও দেশপ্রেমের দিকনির্দেশনা দেবে।

২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে তিনি বলেছিলেন, ‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এটাই আমার ঠিকানা। এই দেশ, এই দেশের মানুষই আমার সবকিছু। কাজেই আমি দেশের বাইরে যাব না।’ এ কথায় বোঝা যায়, তার জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশের মানুষ ও দেশ।

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি বিএনপির সভায় যুক্ত হয়ে তিনি বলেন, 'আপনাদের শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে আরও উজ্জীবিত হয়ে আগামী নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

এমন কাজ করবেন না যাতে এতদিনের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ বৃথা যায়। মনে রাখুন—‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ’।' এই উক্তিতে দেশের জন্য দায়িত্বশীলতা এবং দলের প্রতি আনুগত্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

গত বছর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর মুক্তি পান খালেদা জিয়া। ৭ আগস্ট নয়াপল্টনের বিএনপির সমাবেশে তিনি বলেন, ‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।’

গত বছর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর মুক্তি পাওয়ার পর ৭ আগস্ট নয়াপল্টনের বিএনপির সমাবেশে তিনি বলেন, ‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।’ এই বক্তব্যে দেখা যায়, ব্যক্তিগত ক্ষতি বা প্রতিশোধের চেয়ে দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধিকে তিনি সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছেন।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আরও একবার নিজের অন্তরের অনুভূতি প্রকাশ করেন, 'আমার এই স্বজনহীন জীবনেও দেশবাসীই আমার স্বজন। আল্লাহ আমার একমাত্র ভরসা। যেখানেই থাকি, যতক্ষণ বেঁচে থাকবো, দেশবাসীকে ছেড়ে যাবো না।' এ কথায় তার অকৃত্রিম দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতা স্পষ্ট।

১৯৮২ সালে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ১৯৮৩ সালে স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নামেন খালেদা জিয়া। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় ৭–দলীয় ঐক্যজোট। বিশ্লেষকরা মনে করেন, মূলত তাঁর নেতৃত্বের কারণে এরশাদের পতন সম্ভব হয়। দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলনে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত হন।

খালেদা জিয়ার বক্তব্যের মূল ভাবনা ছিল জনগণের শক্তিতে বিশ্বাস, গণতন্ত্রের প্রতি অটল সংকল্প এবং দেশের জন্য আত্মত্যাগ। তিনি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি শুধুমাত্র জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই সম্ভব। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব তাঁর কথায় সবসময় প্রতিফলিত হয়েছে।

আজ তার প্রয়াণে আমরা শোকাহত, কিন্তু তাঁর জীবন ও বক্তব্য আমাদের সাহস, ধৈর্য এবং সংগ্রামের অনুপ্রেরণা জোগাবে। খালেদা জিয়ার দৃষ্টান্ত মনে করিয়ে দেয়, দেশের কল্যাণের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ বড় নয় এবং দেশের জন্য দায়বদ্ধ হয়ে কাজ করাই সত্যিকারের নৈতিক দায়িত্ব।

(কালের কণ্ঠ । ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫)

মন্তব্যসমূহ