নির্মাণের শহরে হাঁটাচলার ভয়
এগুলো যে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় তা স্বীকার করতেই হবে। নির্মাণাধীন ভবন থেকে ইট বা রড পড়ার কারণে সাধারণ পথচারীর মৃত্যুর খবর প্রায়ই সংবাদে আসে। কয়েক মাস আগে ফার্মগেট এলাকাতে মেট্রোরেলের একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে একজন নিহত হন। মানুষ ফুটপাত দিয়ে হাঁটবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মাথার ওপর যে নিরাপত্তা নেই তা এই শহরে হাঁটতে হাঁটতে টের পাওয়া যায়। এমন এক পরিস্থিতি যেখানে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান কেবল কয়েক সেকেন্ড এবং কয়েক ফুট উঁচু থেকে পড়ে আসা একটি ইট বা রড।
এমন ঘটনা ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যের পাশাপাশি এটি সরাসরি নির্মাণশিল্প, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং নগর নিরাপত্তার গুরুতর ব্যর্থতা। কোনো ধরনের ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনা নেই, নেই নিরাপত্তা বলয়, নেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। এটি চরম অবহেলা এবং অপরাধমূলক গাফিলতির এক রূপ। দায় এড়ানোর উপায় নেই, তবু দায় নেয়ার দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।
নির্মাণের কাজ হবে, ভবন উঠবে, সেতু তৈরি হবে, মেট্রোরেল বসবে, এটি আধুনিক শহরেরই ধারাপাত। কিন্তু সেই নির্মাণ যখন সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে তখন প্রশ্ন ওঠে কে এই শহরের মালিক। একজন পথচারী মাথার ওপর থেকে পড়ে আসা ইটের নিচে চাপা পড়ে মারা গেলে সেই মৃত্যুর কোনো মূল্যায়ন হয় না। বরং ঘটনাটি ভুলে যাওয়া হয় নতুন নির্মাণের শব্দে।
ঢাকা একটি দ্রুত বদলে যাওয়া শহর। কিন্তু এই পরিবর্তনের গতি মানুষের জীবনের চেয়ে কি বেশি মূল্যবান। কোনো শহরই নাগরিকের জীবন বাজি রেখে উন্নয়ন করে না। নিরাপত্তা শহুরে পরিকল্পনার প্রথম শর্ত। পথচারী নিরাপদ না হলে শহরও নিরাপদ না।
মানুষ ফুটপাত দিয়ে হাঁটলে কেন মরতে হবে এই প্রশ্নের উত্তর এ শহরকে দিতেই হবে। সুন্দর শহরের মাপকাঠি শুধু উঁচু ভবন নয়, নিরাপদ রাস্তা এবং নিরাপদ নির্মাণাঙ্গনও। যতক্ষণ পর্যন্ত নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দায়বদ্ধতার আওতায় না আসে, যতক্ষণ পর্যন্ত নগর কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার ন্যূনতম মান নিশ্চিত না করে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যুকে কেবল সংখ্যা হিসেবে দেখা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই শহরে হেঁটে বেড়ানো কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভরই থাকবে।

মন্তব্যসমূহ