চোখ ভেজার এই ভাষা

 

মানুষের অনুভূতি সব সময় শব্দে ধরা পড়ে না। কখনো এক টুকরো দৃশ্য, কোনো গান বা একটি ছোট গল্প হঠাৎ চোখে পানি এনে দেয়। গলা ভারী হয়ে আসে। বুকের ভেতরে নিঃশব্দে জমে ওঠে আবেগের চাপ। এই প্রতিক্রিয়া দুর্বলতার চিহ্ন নয়, বরং মানুষের স্নায়বিক ও আবেগিক বুদ্ধিমত্তার খুব সূক্ষ্ম প্রকাশ।

মস্তিষ্কে আবেগের ঘর বলা হয় লিম্বিক সিস্টেমকে। যখন কোনো দৃশ্য বা ঘটনা ভালোবাসা, ক্ষতি, মানবিকতা, স্মৃতি কিংবা ন্যায়ের বোধকে স্পর্শ করে, তখন সেখানেই আবেগের ঝড় তৈরি হয়। সেই ঝড়ের রেশই চোখে অশ্রু হয়ে বেরিয়ে আসে। মানুষ শুধু দুঃখে কাঁদে না। বিস্ময়, গর্ব, স্বস্তি, স্নেহ বা সৌন্দর্যের অনুভবও অশ্রু নামিয়ে দিতে পারে। এই বিস্তৃত পরিসরই মানুষকে আবেগের দিক থেকে জটিল করে তোলে।

একটু আগেই ফেসবুকে একটি দৃশ্য দেখলাম। খুব বড় কোনো ঘটনা নয়, ছোট্ট একটি মুহূর্ত। একটি মানুষ, একটি সংলাপ, একটুকরো পরিস্থিতি। তবুও সেই দৃশ্য দেখার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ চোখ ভিজে উঠলো, গলাটাও ভারী হয়ে এলো। মনটা অদ্ভুতভাবে স্পর্শ হলো, মনে হল এই ছোট্ট মুহূর্তে কত গভীর অনুভূতি লুকিয়ে আছে। কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে সাধারণ দৃশ্যগুলোই আমাদের সবচেয়ে বেশি আবেগের সঙ্গে সংযুক্ত করে।

সহানুভূতি এখানে বড় ভূমিকা রাখে। অন্যের অবস্থার সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে দেখার ক্ষমতা মানুষকে আলাদা করে। কারও বেদনা দেখে নিজের পুরনো ক্ষত উঁকি দিতে পারে। আবার কারও সাফল্য দেখে মনে হতে পারে নিজেরই পরিশ্রমের ফসল দেখছি। এই মেলবন্ধনই কাঁদার ভাষা তৈরি করে।

হরমোনাল রেসপন্সও এতে কাজ করে। চাপ বাড়লে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন বেড়ে যায়। শরীর সেই চাপ কমাতে অশ্রু ব্যবহার করে। গলা ভারী হয়ে ওঠার কারণটা আরও শারীরিক। আবেগের সময় গলার মাংসপেশি টাইট হয়ে যায়। ফলে শব্দ আটকে যায়, চোখ ভিজে ওঠে।

অনেক সময় এই প্রতিক্রিয়া স্মৃতি টেনে আনে। হারিয়ে যাওয়া মানুষ, পুরনো সম্পর্ক, অসম্পূর্ণ আশা বা বাল্যকালের কোনো মুখভঙ্গি আমাদের এমন জায়গায় নিয়ে যায় যেখানে সময়ের রুক্ষতা পৌঁছাতে পারে না। তাই একই জিনিস কারও কাছে নিরুত্তাপ, আর কারও কাছে চোখ ভেজানো স্মৃতি হয়ে থাকে।

সংস্কৃতি ও শিল্পও এই আবেগকে বাড়িয়ে তোলে। সাহিত্য, সংগীত, সিনেমা, নাটক বা বাস্তব জীবনের মানবিক গল্প আমাদের অনুভূতির গভীর স্তর ছুঁয়ে দেয়। এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বেঁচে থাকা শুধু বায়োলজিকাল প্রক্রিয়া নয়, বরং অনুভবেরও এক দীর্ঘ যাত্রা।

শেষ পর্যন্ত চোখের পানি তাই একধরনের নীরব ভাষা। এখানে কণ্ঠের দরকার নেই। বরং এই ভাষা যতটা নিঃশব্দ, ততটাই সত্য। মানুষের ভেতরের জটিলতার প্রমাণ, আবার সেই জটিলতারই কোমলতম চিহ্ন। এটি আমাদের জানিয়ে দেয়, আমরা এখনো অনুভব করতে পারি। এখনো ভেতরে মানবিকতা বেঁচে আছে।


মন্তব্যসমূহ