খেলনা হেলমেট আর বেপরোয়া গতি, বাইক দুর্ঘটনার নির্মম বাস্তবতা


ঢাকার রাস্তায় এখন মোটরসাইকেল শুধু ব্যক্তিগত বাহন নয়, নগর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাইড শেয়ারিং সেবার বিস্তারে হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন বাইকে চড়ে কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা জরুরি গন্তব্যে ছুটছেন। দ্রুত যাতায়াতের সুবিধা থাকলেও এর আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ ঝুঁকি। দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়, সড়কে সবচেয়ে বেশি প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে এই মোটরসাইকেল।

গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২২৩ জন নিহত ও ১৩২ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে মোট ৫৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৪৬ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ২০৪ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৩৭.৮৬ শতাংশ এবং মোট নিহতের ৪০.৮৪ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। এর আগে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনও জানিয়েছিল, জানুয়ারিতে ২০৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৯৬ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৪০.২৪ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান ধারাবাহিক এক সংকটের প্রতিচ্ছবি।

কেন মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনা এত বেশি ঘটে? কারণ একাধিক। প্রথমত, বেপরোয়া গতি। শহরের যানজটে আটকে থাকা গাড়ির ফাঁক গলে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাইকারদের মধ্যে প্রায় স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়েছে। সময় বাঁচাতে গিয়ে ঝুঁকিকে তুচ্ছ করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, অদক্ষ বা অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক। অনেকেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন ছাড়াই সড়কে নামছেন। তৃতীয়ত, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অনির্দিষ্ট আয়ের চাপ। বিশেষ করে রাইড শেয়ারিং চালকদের অনেক সময় ক্লান্তি বা মানসিক চাপ নিয়েই রাস্তায় থাকতে হয়। এতে মনোযোগে ঘাটতি তৈরি হয়।

সড়ক ও যানবাহনের ত্রুটিও বড় কারণ। খানাখন্দে ভরা রাস্তা, হঠাৎ গতি নিয়ন্ত্রণকারী বাঁধা, অপরিকল্পিত ইউ-টার্ন বা সিগন্যাল ব্যবস্থার দুর্বলতা মোটরসাইকেলের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ চার চাকার গাড়ির তুলনায় বাইকের ভারসাম্য কম স্থিতিশীল। সামান্য ধাক্কা বা ব্রেকের ভুলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এর সঙ্গে যোগ হয় ট্রাফিক আইন অমান্য, দুর্বল নজরদারি, বিআরটিএর সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং সামগ্রিক সড়ক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি।

তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো হেলমেট সংস্কৃতি। চালকের হেলমেট তুলনামূলক ভালো হলেও যাত্রীর জন্য দেওয়া হেলমেট অনেক ক্ষেত্রেই নিম্নমানের, কখনো কখনো খেলনার মতো। অনেক সময় সেটি শুধু ট্রাফিক পুলিশের চোখ এড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। অথচ মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৪২ শতাংশ এবং গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। মানহীন হেলমেট সেই সুরক্ষা দিতে পারে না।

ঢাকায় এখন প্রায় শতভাগ আরোহীর হেলমেট পরা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। কঠোর নজরদারি ও জরিমানার কারণে নগর এলাকায় হেলমেট ছাড়া বাইক চালানো বা চড়া কঠিন হয়ে গেছে। কিন্তু ঢাকার বাইরে একই চিত্র দেখা যায় না। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা থাকলে সচেতনতার ঘাটতিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে শুধু আইন নয়, মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। তরুণদের বেপরোয়া চালনা বন্ধ করতে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ভূমিকা রাখতে হবে। রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোকে মানসম্মত হেলমেট নিশ্চিত করা ও চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে মান নিয়ন্ত্রণ, লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া কঠোর করা এবং সড়ক অবকাঠামো উন্নত করা অপরিহার্য।

মোটরসাইকেল গতি দেয়, সময় বাঁচায়, আয় তৈরি করে। কিন্তু সামান্য অবহেলা, একটি নিম্নমানের হেলমেট বা এক মুহূর্তের বেপরোয়া সিদ্ধান্ত একটি পরিবারকে চিরদিনের জন্য শোকের মধ্যে ফেলে দিতে পারে। এখন প্রয়োজন পরিসংখ্যান দেখে শোক প্রকাশ নয়, বাস্তব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত।

(আগামীর সময় । ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)

মন্তব্যসমূহ