দরকারের সময়েই কেন ভাড়া বাড়ে

ভোরের আলো ফুটতেই তাড়া শুরু হয়। বাচ্চার স্কুল, অফিসের সময়, মাথার ভেতর ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে বাজতে থাকে। এমন সময় রিকশা থামালেন, চালক ভাড়া বললেন স্বাভাবিকের দ্বিগুণ। আপত্তি করার সুযোগ কোথায়? দেরি হলে স্কুলে বকুনি, অফিসে কাটতি। প্রয়োজনের এই চাপটাই হয়ে ওঠে ভাড়া বাড়ানোর সবচেয়ে বড় কারণ।

এ দৃশ্য নতুন নয়। রাত গভীর হলে, যানবাহন কমে এলে, বৃষ্টি নামলে বা হঠাৎ জরুরি দরকার পড়লে একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন মানুষ। দর কষাকষি করতে গেলেই শুনতে হয়, যেতে না চাইলে অন্য যান খুঁজে নিন। কিন্তু সেই অন্য যান কোথায়? সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা মানুষ শেষ পর্যন্ত বাড়তি ভাড়াই দেন।

ঈদ এলে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়। প্রিয়জনের সঙ্গে উৎসব করতে মানুষ ছুটে যান গ্রামে। বাসস্ট্যান্ডে উপচে পড়া ভিড়, টিকিটের হাহাকার। এই সুযোগে ভাড়া হয়ে যায় দ্বিগুণ, কোথাও তারও বেশি। যাত্রী জানেন অন্যায় হচ্ছে, তবু গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

নির্বাচনের সময় একই ছবি আবার দেখা যায়। ভোট দিতে বাড়ি ফিরবেন অনেকেই। কিন্তু দেখা যায় ভাড়া তিনগুণের কাছাকাছি। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে যাওয়ার পথেও তখন বাড়তি অর্থের বোঝা। যেন প্রয়োজন মানেই বাড়তি দাম।

পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্তদেরও যুক্তি আছে। তারা বলেন, চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে, এটাই বাজারের নিয়ম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সবকিছু কি কেবল বাজারের হিসাবেই চলবে? মানুষের অসহায় মুহূর্ত, জরুরি প্রয়োজন, পারিবারিক টান, নাগরিক দায়িত্ব কি কোনো বিবেচনায় আসবে না?

সমস্যাটা শুধু টাকার নয়। এটি ন্যায়বোধেরও প্রশ্ন। একজন যাত্রী যখন বুঝে যান তার প্রয়োজনকে পুঁজি করা হচ্ছে, তখন ক্ষোভ জমে। বিশ্বাস কমে যায়। চালক আর যাত্রীর সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায় টানাপোড়েনের।

আইন আছে, ভাড়া নির্ধারণ আছে, নজরদারির ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু প্রয়োগের জায়গায় ঘাটতি রয়ে যায়। ফলে একই চিত্র বারবার ফিরে আসে। মানুষ জানেন, দরকারের সময় বাড়তি দিতে হবে, তাই মানসিক প্রস্তুতিও নিয়ে রাখেন।

কিন্তু এভাবে কত দিন? প্রয়োজনকে জিম্মি করে বাড়তি আদায় করার সংস্কৃতি বদলানো কি সম্ভব নয়? সম্মিলিত উদ্যোগ, কার্যকর তদারকি আর সচেতনতা থাকলে পরিস্থিতি বদলাতেই পারে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মনে রাখতে হবে সড়কে যে মানুষটি যাত্রী, সেও কারও বাবা, মা, সন্তান বা স্বজন। তার জরুরি প্রয়োজনকে সুযোগ বানানো নয়, সহানুভূতির জায়গা থেকে দেখা উচিত।

দরকারের মুহূর্তে যদি পাশে দাঁড়ানো যেত, তবে হয়তো ভাড়ার অঙ্কটা একটু কম হলেও মানবিকতার হিসাবটা অনেক বড় হয়ে উঠত।

মন্তব্যসমূহ