কবে জাগবে আমাদের নিরাপত্তা চেতনা?


রাজধানীর উত্তরায় একটি আবাসিক ভবনে আগুন লেগে ছয়জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে তিনজন একই পরিবারের। বাবা, মা আর আড়াই বছরের সন্তান। আরেক পরিবারে বাবার সঙ্গে ছেলে ও ভাতিজিও ছিল। ঘটনার আকস্মিকতা ও অসহায়ত্ব শহরবাসীকে আবারও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমরা আদৌ কি নিরাপদ বাসায় থাকি?

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, আগুনের সূত্রপাত হয় দোতলায়। মুহূর্তেই আগুন বাড়তে থাকে এবং তৃতীয় তলায় ছড়িয়ে পড়ে। দুই তলার বাসিন্দারা প্রাণে বাঁচলেও ধোঁয়া ওপরে উঠে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার ছয়জনের মৃত্যু ডেকে আনে।
ঢাকার বহুতল আবাসনের বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। অনেক বিল্ডিংয়ের নকশা এমনভাবে করা যে নিচে আগুন লাগলে ওপরে থাকা মানুষদের পালানোর পথ নেই। জানালা আর বারান্দায় গ্রিল লাগানো। পাশেই আরেকটি ভবন। বাতাস ঢোকার ফাঁক নেই, জরুরি বহির্গমন তো দূরের কথা। বাসা যেন নিরাপত্তার জন্য তৈরি কারাগার। আগুন লাগলে সেই নিরাপত্তাই মৃত্যুঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়।
আগুন কোনো নির্দিষ্ট জায়গা, সময় বা ঘর চেনে না। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, গ্যাস লিক, রান্নাঘর, কিংবা অসাবধানতায় যেকোনো মুহূর্তে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। উন্নত শহরগুলোতে এজন্য রয়েছে ফায়ার অ্যালার্ম, স্প্রিংকলার সিস্টেম, জরুরি সিঁড়ি, নিয়মিত ড্রিল এবং সচেতনতা। আমাদের শহরে এসব কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিল্ডিং মালিকরা নিরাপত্তা খরচকে বাড়তি ব্যয় মনে করেন। ভাড়াটিয়ারা তা দাবি করতেও সংকোচে ভোগেন।
একটি মৌলিক প্রশ্ন এখানে জরুরি। আমাদের কয়জনের বাসায় আগুন নেভানোর এক্সটিংগুইশার আছে? কয়জন জানি কীভাবে তা ব্যবহার করতে হয়? আমরা বিপদের সময় প্রতিবেশী বা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করি।কিন্তু আগুনের বিপর্যয়ে সময় মাত্র কয়েক মিনিটের। সেই সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতিই জীবন বাঁচাতে পারে।
এই শহরে প্রতিদিন নতুন বাড়ি উঠছে, নতুন ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে, মানুষ বাসা পাল্টাচ্ছে। কিন্তু নিরাপত্তার মান একই রয়ে গেছে। আগুনের পর আমরা শোক করি, আলোচনা করি, দায় খুঁজি, কিন্তু প্রস্তুতি নেই না। অথচ এই প্রস্তুতিই আমাদের সবচেয়ে প্রয়োজন। নিরাপদ শহর মানে শুধু সুদৃশ্য ভবন নয়, জীবন রক্ষার পথ নিশ্চিত করা।
উত্তরার এই দুর্ঘটনা আমাদের আবার স্মরণ করিয়ে দিল শহরবাসী কতটা ভঙ্গুর। এখন প্রশ্ন একটাই, আমরা কি অন্তত ভবিষ্যতের আগুনের আগে জেগে উঠব, নাকি আবারো শোকের পর নতুন করে শোকই লিখব?

মন্তব্যসমূহ