ঢাকার ক্ষুধা আর মায়ার অদৃশ্য গল্প
মহাখালীর একটি রেস্টুরেন্টে সেদিন দুপুরে খেতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন রুবেল আর আপেল। হাত ধুয়ে বসেছি, ওয়েটার এসে অর্ডার নিচ্ছেন। কথাবার্তার মাঝে হঠাৎ জ্যাকেট পরা এক তরুণ এগিয়ে এসে রুবেলকে জিজ্ঞেস করল, আমাকে খেতে দিবেন? রুবেল তার চেহারার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বলল, বসেন। তরুণ পেছনে গিয়ে বসে। তার চোখ বারবার ওয়েটার আর টেবিলের দিকে। যেন খাবার আসার অপেক্ষার প্রতিটা মুহূর্ত তার জন্য দীর্ঘ।
অনেক ক্ষুধা লাগলে মানুষের চোখের ভেতর একটা অস্থিরতা জমে। খাবারের গন্ধ আর দৃশ্য তখন যেন সহ্য হয় না। ওই তরুণের চোখে সেই ক্ষুধা স্পষ্ট ছিল। কতক্ষণ বা কয়বেলা সে কিছু খায়নি, জানার উপায় নেই। ঢাকায় এমন দৃশ্য এখন আর বিরল নয়। মাঝেমধ্যে ট্রাফিক সিগন্যালে কিংবা ফুটপাথে বাচ্চা কোলে নিয়ে কেউ এসে বলে, ভাত খাওয়াবেন একটু? অনেকেই ফিরেও তাকায় না। প্রতারণার নতুন নতুন কৌশল দেখে মানুষ উদাসীন হয়ে গেছে। সন্দেহ আর উদাসীনতা মিলে মায়া-দয়ার জায়গাটা ছোট হয়ে গেছে।
কয়েক দিন আগেই বাংলামোটরের মোড়ে এক দম্পতিকে দেখেছিলাম। বাচ্চাকে কোলে নিয়ে তারা পথচারী থামিয়ে বলছিলেন, আমাদের একটু ভাত খাওয়াবেন? কেউ সাড়া দিচ্ছিল না। আবার সেদিন গুলশান এক নম্বরের গোলচত্বরে এক বৃদ্ধাকে দেখলাম। তিনি এগিয়ে এসে বললেন, কিছু খাওয়াবেন? ক্ষুধার কথা বললেন ঠিকই, কিন্তু তার চোখে মুখে ক্ষুধার সেই বদলে যাওয়া ছাপ দেখা গেল না। ক্ষুধা মানুষের ভেতর যে তীব্রতা তৈরি করে তা লুকানো যায় না। কয়েক বেলা না খেলে চেহারা আর চোখের ভিতর তার চিহ্ন ফুটে ওঠে।
রুবেল বারবার ওয়েটারকে তাগাদা দিচ্ছিলেন। আমাদের টেবিলে খাবার চলে এল। তরুণের টেবিলে তখনও যায়নি। কিছুক্ষণ পর সে উঠে এসে আমাদের টেবিলে বসতে চাইল। কিন্তু কাগজপত্র আর ফাইলপত্রের ভিড়ে জায়গা হলো না। রুবেল তাকে আবার পেছনে বসতে বলল। তার চোখে তখনো উত্তেজনা, অপেক্ষা আর ক্ষুধার টান। শেষে ওয়েটার এসে তার টেবিলেও খাবার রাখল।
আমরা খেতে আর কথায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। বের হওয়ার সময় খোঁজ করেও তরুণকে আর পাওয়া গেল না। ঢাকার মানুষের ভিড়ে কেউ এভাবে এসে মায়া লাগিয়ে চলে যায়। আবার কেউ এমন আচরণ করে যে সামান্য সময় থাকলেই বিরক্তি জমে। এই শহরের চরিত্রই এমন। বৈপরীত্যে ভরা, অদ্ভুত আর কখনো অসম্ভব নির্মম।
সেদিন কাকলীর ফুটওভার ব্রিজে ওঠার সময় এক নারীকে দেখলাম। হাতে দুই ব্যাগ। একটায় দুপুরের খাবারের বাক্স। অন্যটায় ভ্যানিটি ব্যাগ। তার স্নিকার জীর্ণ। গোড়ালির কাছে ছেঁড়া। পরনের থ্রিপিচ বহু ব্যবহারে রঙহীন। ওড়নাটা মাথায় জড়িয়ে তিনি সিঁড়ি পার হচ্ছিলেন। তার চলাফেরা, পোশাক ও ক্লান্ত মুখে শহরের আরেক গল্প ফুটে উঠছিল। ক্ষুধা নয়, কিন্তু দিনযাপনের বিষণ্ণতা। যেন অনেকদিন ধরে লড়াই করে চলেছেন।
ঢাকা শহর ইট পাথরের নির্মমতা দিয়ে যতটা পরিচিত, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে ছোট ছোট কোমল দৃশ্য। ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা, মায়া, সন্দেহ আর উদাসীনতা মিলিয়ে এখানে মানুষের জীবন এগোয়। প্রতিদিনই ব্যস্ততার আড়ালে এমন শত শত গল্প ভাসে। দেখি কেউ, দেখি না কেউ। মনে রাখি অল্প, ভুলে যাই আরও অল্প। তবু কোনো এক অচেনা মুহূর্তে আবার মনে পড়ে যায়, এই শহরে বাঁচা মানে কেবল দৌড়ানো নয়। এই শহরে বাঁচা মানে অন্যের গল্পও একটু দেখা, একটু বোঝা।

মন্তব্যসমূহ