ঘামের গন্ধ ও আমাদের নীরব যন্ত্রণা


মেট্রোর দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে অস্বস্তিটা শুরু হয়, তার নাম শুধু ভিড় নয়। ভিড়ের মধ্যে একটা বিশেষ সমস্যা আছে, যা নিয়ে সাধারণত কেউ প্রকাশ্যে কথা বলেন না। কিন্তু প্রতিদিন লাখো মানুষ এই সমস্যার মুখোমুখি হন, নাকে কাপড় গুঁজে কিংবা মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে। সমস্যাটির নাম শরীরের দুর্গন্ধ, বিশেষত ঘামের তীব্র গন্ধ।

বিষয়টি শুনতে হালকা মনে হলেও বাস্তবে এটি যারপরনাই অস্বস্তিকর। সিনেমা হলে পাশের আসনে বসা মানুষটির শরীর থেকে যখন তীব্র গন্ধ আসে, বা অফিসের লিফটে মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড কারো সঙ্গে একসঙ্গে থাকতে হয় এবং সেই ত্রিশ সেকেন্ড মনে হয় যেন তিরিশ মিনিট, তখন বোঝা যায় এই সমস্যাটি আসলে কতটা বাস্তব। মানুষ সহ্য করে, কিন্তু কিছু বলে না। কারণ সামাজিক ভদ্রতা বলে একটা ব্যাপার আছে। সরাসরি কাউকে বলা যায় না যে তার শরীর থেকে দুর্গন্ধ আসছে। ফলে একটা অদ্ভুত নীরব যন্ত্রণায় ভুগতে হয়।

ঘাম শরীরের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। মানুষের শরীরে প্রায় ২০ থেকে ৪০ লাখ ঘর্মগ্রন্থি থাকে। এই গ্রন্থিগুলো শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং ত্বককে সুরক্ষিত রাখে। মজার বিষয় হলো, ঘাম নিজে কিন্তু প্রায় গন্ধহীন। তাহলে দুর্গন্ধ আসে কোথা থেকে? শরীরের বিভিন্ন ভাঁজে, বিশেষত বগলে, পায়ে ও কুঁচকিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া ঘামের সঙ্গে মিশে এমন কিছু রাসায়নিক যৌগ তৈরি করে, যেগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র গন্ধ সৃষ্টি করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যার নাম ব্রোমহিড্রোসিস।

বাংলাদেশের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশে সমস্যাটি আরও প্রকট। বছরের একটা বড় অংশজুড়ে প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্রতা। রাস্তায় বের হলেই ঘাম, গণপরিবহনে উঠলে আরও বেশি। এর মধ্যে আছে জামাকাপড় দেরিতে ধোয়ার অভ্যাস, গোসলে অনিয়ম এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সচেতনতার অভাব। তবে সবাইকে এক কাতারে ফেলা ঠিক নয়। অনেকের ক্ষেত্রে এটি শারীরিক সমস্যা। অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার প্রবণতাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে হাইপারহাইড্রোসিস বলা হয় এবং এটি নিয়ন্ত্রণ করা সবসময় সহজ নয়।

তবে যে কারণেই হোক, সমস্যাটির একটা সমাধান দরকার এবং সেই সমাধান শুরু হওয়া উচিত ব্যক্তির নিজের জায়গা থেকে। প্রতিদিন অন্তত একবার ভালো করে সাবান দিয়ে গোসল করা, বিশেষ করে বগল ও পায়ের আঙুলের ফাঁকে মনোযোগ দেওয়া, গোসলের পর শরীর ভালোভাবে মুছে নেওয়া এবং পরিষ্কার কাপড় পরা। এই সহজ অভ্যাসগুলোই ঘামের গন্ধ অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারে। যারা বেশি ঘামেন, তাদের জন্য অ্যান্টিপার্সপিরেন্ট বা ডিওডোরেন্ট ব্যবহার কার্যকর। এগুলো ঘর্মগ্রন্থির কার্যকলাপ কমিয়ে দেয় বা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। সুতির কাপড় পরলে ঘাম দ্রুত শুকায়, ফলে ব্যাকটেরিয়া কম জন্মায়।

খাদ্যাভ্যাসও এই বিষয়ে ভূমিকা রাখে। রসুন, পেঁয়াজ, মশলাদার খাবার এবং অতিরিক্ত মাংস খেলে ঘামের গন্ধ বাড়ে। পর্যাপ্ত পানি পান, শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া শরীরের ভেতর থেকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। কারো যদি পরিষ্কার থাকার পরেও সমস্যা না কমে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ কখনো কখনো এর পেছনে ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা বা অন্য কোনো শারীরিক কারণ থাকতে পারে।

এখানে একটি সামাজিক দিকও আছে। যে মানুষটি ঘামের গন্ধ নিয়ে চলে বেড়াচ্ছেন, অনেক সময় তিনি নিজেও জানেন না যে তার এই সমস্যা আছে। কারণ নিজের শরীরের গন্ধে মানুষ ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায়। কাছের কেউ সরাসরি না বললে তিনি বুঝতেই পারেন না। এই জায়গায় সম্পর্কের উষ্ণতা কাজে আসে। ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা পরিবারের কেউ যদি সযত্নে, মমতার সঙ্গে বিষয়টি জানান, তাহলে সেই মানুষটির উপকার হয়। এটি অবজ্ঞা নয় বরং প্রকৃত মঙ্গলকামনা।

মেট্রো বা বাসের ভেতরে অপরিচিত কাউকে সরাসরি কিছু বলা সম্ভব না-ও হতে পারে। কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা সবসময়ই সম্ভব। প্রতিদিনের সামান্য কিছু যত্ন, একটু সচেতনতা, পরিষ্কার থাকার অভ্যাস, এটুকুই যথেষ্ট নিজেকে এবং আশেপাশের মানুষদের একটু স্বস্তিতে রাখার জন্য। গণপরিবহনের ওই ভিড়ে নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকারটুকু আমাদের সবার আছে।