যে মাটি ছেড়ে যায়, সে মাটিই তাকে ডাকে


রহিম মিয়া প্রথম যেদিন গ্রাম ছেড়েছিলেন, সেদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই বেরিয়ে পড়েছিলেন। পেছনে পড়ে ছিল ধানখেত, পুকুরের জল, মায়ের মুখ। সামনে ছিল শুধু একটি শব্দ, 'ঢাকা'। সেই শব্দের ভেতরে তখন তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন আলো, রুজি, ভবিষ্যৎ। বিশ বছর পর সেই রহিম মিয়া এখন মিরপুরের একটি গলিতে থাকেন। ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়, মাস শেষে বেতন আসে, ব্যাংকে সামান্য সঞ্চয়ও জমেছে। কিন্তু প্রতি রাতে ঘুমের আগে তিনি একবার হলেও ভাবেন, গ্রামে যদি থাকা যেত।

এই গল্প শুধু রহিম মিয়ার নয়। এই উপমহাদেশের লাখ লাখ মানুষের বুকের ভেতরে এই একই টানাপোড়েন চিরকাল ধরে চলে আসছে। গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা, আর শহরে এসে গ্রামকে মনে করা। এই দুটি আকাঙ্ক্ষা যেন একে অপরের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকে, অথচ দুটিই সমান সত্য।

গ্রামগুলো একসময় ছিল সম্পূর্ণ এক জগৎ। সেখানে খাদ্য ছিল, পরিবার ছিল, উৎসব ছিল, একে অপরের সঙ্গে বেঁধে থাকার এক অদৃশ্য সুতো ছিল। কিন্তু ছিল না পর্যাপ্ত কাজ। ছিল না ভালো হাসপাতাল, মানসম্মত বিদ্যালয়, ক্যারিয়ারের সুযোগ। তাই মানুষ হিসাব কষল। পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে হলে গ্রামের মায়া ছেড়ে শহরের পথ ধরতে হবে। এই সিদ্ধান্তটি যুক্তির, কিন্তু এর ভেতরে যে কষ্ট লুকিয়ে থাকে, তা কোনো হিসাবের খাতায় লেখা হয় না।

শহর মানুষকে নেয়। তাকে বাসস্থান দেয়, কাজ দেয়, ব্যস্ততা দেয়। কিন্তু সে যা দেয় না, তার তালিকাটিও কম দীর্ঘ নয়। শহরে প্রতিবেশীর নাম জানা যায় না। সকালে বের হয়ে রাতে ফেরা পর্যন্ত মানুষ কেবল ছুটতে থাকে। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে থাকতে একটা অদ্ভুত ক্লান্তি জমে যায় মনের ভেতরে। শহরের বাতাসে ধুলো বেশি, গাছ কম। শব্দদূষণ এত বেশি যে নিজের চিন্তাটুকুও শোনা যায় না মাঝে মাঝে। এই পরিবেশে বড় হচ্ছে শহরের সন্তানরা, যারা কখনো জানতে পারে না ভোরের শিশিরে পা ভেজানোর অনুভূতি কেমন হয়।

তাই যারা শহরে জন্মেছেন বা বড় হয়েছেন, তাদের একটা বড় অংশই এখন গ্রামের দিকে মুখ ফেরাতে চাইছেন। তারা সাপ্তাহান্তে যাচ্ছেন কোনো নিরিবিলি জায়গায়, নদীর ধারে, বাগানবাড়িতে। কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে স্বপ্ন দেখছেন, শহর ছেড়ে একেবারে গ্রামে ফিরে যাওয়ার। জৈব সবজি চাষ করবেন, পুকুরে মাছ ধরবেন, সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে চাঁদ দেখবেন। এই স্বপ্নটিও সত্যি। এই ক্লান্তিটিও বাস্তব।

কিন্তু এখানে একটি বড় প্রশ্ন রয়ে যায়। যে গ্রামের জন্য শহরের মানুষ আকুল হন, সেই গ্রাম কি আজও আগের মতো আছে? গ্রামে যিনি ফিরে যেতে চান, তিনি কি ফিরে পাবেন সেই নির্মল বাতাস, সেই শান্ত পরিবেশ? বাস্তবতা হলো, গ্রামও বদলে গেছে। ইটভাটার ধোঁয়া এখন গ্রামের আকাশেও উঠছে। কৃষিজমি ভরাট হচ্ছে। নদী শুকিয়ে আসছে। শহরের যে সমস্যাগুলো থেকে পালাতে চাওয়া হচ্ছে, তার অনেকটাই এখন ধীরে ধীরে গ্রামের দরজায় পৌঁছে গেছে।

আর যে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছেন, তার জন্যও ফিরে যাওয়াটা সহজ নয়। দীর্ঘ বছরের অভ্যাস, সন্তানের পড়াশোনা, চাকরির বাঁধন, এই সব মিলিয়ে শহর তাকে আর সহজে ছাড়ে না। গ্রামে যে জমি ছিল, তা হয়তো ভাগ হয়ে গেছে। গ্রামের বাড়িতে থাকার মতো পরিবেশ নেই। আবার নতুন করে শুরু করার মতো সাহস বা সুযোগও সবার থাকে না।

এই যে দুই দিক থেকে দুই দল মানুষ একে অপরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন, এটি আসলে একটি গভীর সত্যের প্রতিফলন। মানুষ কেবল অর্থের জন্য বাঁচে না, কেবল শান্তির জন্যও বাঁচে না। সে দুটোই চায়। এক সঙ্গে। কিন্তু পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই এই দুটি এখনও আলাদা জায়গায় পাওয়া যায়। অর্থ আসে শহর থেকে, শান্তি আসে গ্রাম থেকে। এই ব্যবধানটুকু যতদিন থাকবে, মানুষের এই ছুটে চলা থামবে না।

উন্নত দেশগুলোতে এই সমস্যার কিছুটা সমাধান হয়েছে দূরবর্তী কর্মসংস্কৃতির মাধ্যমে। প্রযুক্তির কল্যাণে অনেকেই এখন শহরের বাইরে বসে শহরের কাজ করতে পারছেন। বাংলাদেশেও এই ধারা ধীরে ধীরে আসছে। তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ গ্রামে বসেই অনলাইনে কাজ করছেন। কেউ কেউ গ্রামে ফিরে কৃষি উদ্যোগ, পর্যটন ব্যবসা বা কুটিরশিল্পে নতুন পথ তৈরি করছেন। এই উদ্যোগগুলো আশার কথা বলে।

তবে বাস্তব সত্য হলো, এই পরিবর্তন এখনও ব্যাপক হয়নি। বেশির ভাগ মানুষের কাছে পছন্দটা এখনও সেই একই, অর্থ না শান্তি, শহর না গ্রাম। এবং বেশির ভাগ মানুষকেই পেটের টানে শহর বেছে নিতে হচ্ছে, মনের টান উপেক্ষা করে।

রহিম মিয়া প্রতি ঈদে গ্রামে যান। সেই কটা দিন তিনি যেন অন্য মানুষ হয়ে যান। নিজের হাতে বাগানে কাজ করেন, পুকুরে ছিপ ফেলেন, রাতে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে তারা গোনেন। কিন্তু ছুটি শেষ হলে আবার ফেরেন। কারণ ছেলেটার কোচিং আছে, মেয়েটার পরীক্ষা আছে, বাড়িওয়ালার ভাড়া আছে।

এই ফেরার পথে বাসের জানালা দিয়ে তিনি দেখেন, অন্ধকারে গ্রামের আলো জ্বলছে। মনের ভেতরে কোথাও একটা টান অনুভব করেন। সেই টানের কোনো নাম নেই, কোনো সমাধান নেই। আছে শুধু একটা নীরব বোঝাপড়া, যে মাটি ছেড়ে গেছেন, সেই মাটিই তাকে বারবার ডাকছে। আর সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটাই হয়তো এই দেশের সবচেয়ে জরুরি কাজ।