ফেসবুক খুললেই দেখা যায়, সবাই কোথাও না কোথাও বেড়াতে গেছে। কেউ পাহাড়ে, কেউ সমুদ্রে, কেউবা নতুন রেস্তোরাঁয়। ছবিতে হাসি, ক্যাপশনে কৃতজ্ঞতা। 'জীবন সুন্দর', 'আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি', 'বেস্ট ডে ইভার'। স্ক্রোল করতে করতে মনে হয়, পৃথিবীর সবাই বুঝি দারুণ সময় কাটাচ্ছে। শুধু আমি একা রাত জেগে ছাদ দেখছি।
এই অনুভূতিটা এখন শুধু একজনের নয়।
সামাজিক মাধ্যম আসলে একটি অদৃশ্য মঞ্চ তৈরি করেছে। সেই মঞ্চে প্রত্যেকে অভিনেতা। পোশাক পরা হয় যত্ন করে, আলো ঠিক করা হয়, কোণ বেছে ছবি তোলা হয়। তারপর সেরা ছবিটি বেছে আপলোড করা হয়, কারণ বাকিগুলোতে চোখের নিচের কালো দাগ বেশি স্পষ্ট ছিল, কিংবা হাসিটা যথেষ্ট উজ্জ্বল ছিল না। এই বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটাই বলে দেয়, আমরা আসলে কী দেখাতে চাই আর কী লুকাতে চাই।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অভ্যাসের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি আছে। মানুষ স্বভাবতই অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে চায়। সামাজিক মাধ্যম সেই চাওয়াকে আরও তীব্র করে দিয়েছে। একটি পোস্টে কতটি লাইক পড়ল, কতজন মন্তব্য করল, সেটা এখন অনেকের কাছে নিজের মূল্য পরিমাপের একটি অনানুষ্ঠানিক মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। ফলে পোস্ট হয় কেবল সেটুকুই, যা মানুষ পছন্দ করবে। বাকিটা থাকে ড্রাফটে, অথবা বুকের ভেতর।
কিন্তু ভেতরের গল্পটা কেমন? যে মেয়েটি হাসিমুখে রেস্তোরাঁর ছবি দিল, সে হয়তো সেদিন রাতে একা কেঁদেছে। যে ছেলেটি পদোন্নতির খবর জানাল উৎসাহ নিয়ে, সে হয়তো মাসের পর মাস ঘুমাতে পারছে না চাপে। যে দম্পতি প্রতি সপ্তাহে একসঙ্গে বাইরে খাওয়ার ছবি দেয়, তাদের ঘরে হয়তো কথা বলা প্রায় বন্ধ। সামাজিক মাধ্যম এই ফাঁকটুকু দেখায় না।
গবেষণা বলছে, দীর্ঘ সময় সামাজিক মাধ্যমে অন্যের 'সুখী' জীবন দেখতে থাকলে নিজের জীবন সম্পর্কে হতাশা বাড়ে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। অতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার এবং একাকীত্ব ও বিষণ্নতার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আছে। একজন অন্যজনের হাইলাইট রিল দেখে নিজের পুরো জীবনের সঙ্গে তুলনা করছেন, এটা স্বভাবতই একটি অসম লড়াই।
বিষয়টা কেবল ব্যক্তির মনের সমস্যা নয়। পুরো প্ল্যাটফর্মের কাঠামোটাই এভাবে তৈরি। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, এই সব জায়গায় যে কনটেন্ট বেশি এনগেজমেন্ট পায়, সেটাই অ্যালগরিদম বেশি ছড়িয়ে দেয়। উজ্জ্বল ছবি, আনন্দের মুহূর্ত, সাফল্যের গল্প বেশি লাইক পায়, তাই সেগুলোই বেশি দেখা যায়। দুঃখের কথা, ক্লান্তির কথা, ব্যর্থতার কথা সাধারণত ভাইরাল হয় না। ফলে একটি কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি হয়, যেখানে সবাই ভালো আছে বলে মনে হয়।
তবে সম্প্রতি একটু বদল আসছে। কিছু মানুষ সাহস করে লিখছেন নিজের কষ্টের কথা। নিজের মানসিক চাপের কথা, সম্পর্কের জটিলতার কথা, কাজে ব্যর্থতার কথা। এই পোস্টগুলোতেও মানুষ সাড়া দিচ্ছেন অনেক। কারণ সত্যিটা পড়লে মানুষ নিজেকে চেনে। বুঝতে পারে, 'শুধু আমি একা নই।'
আসলে সামাজিক মাধ্যম একটি আয়না হতে পারত, হয়ে উঠেছে একটি মুখোশের দোকান। সেখানে সবাই একটু সুন্দর, একটু সুখী, একটু বেশি সফল সংস্করণ নিজেকে সাজিয়ে রাখে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, জীবনটা বড় মসৃণ। ভেতরে যে খাঁজকাটা দাগ আছে, সেটা ফিল্টারে মুছে যায়।
তবু রাত হলে, ফোন রেখে দিলে, সেই মুখোশ খুলে যায়। ঘরের দেওয়ালের সামনে মানুষ তখন নিজেই থাকে, কোনো লাইক ছাড়া, কোনো দর্শক ছাড়া। সেই মুহূর্তটুকুই হয়তো সবচেয়ে সত্যি। আর সেই সত্যিটাকে একটু বেশি জায়গা দেওয়া দরকার, স্ক্রিনে নয়, নিজের ভেতরে।