৪০০ গজের নীরবতা, স্বচ্ছতার প্রশ্ন


ভোট মানে শুধু ব্যালটে সিল মারা বা ইভিএমে বোতাম টেপা নয়। ভোট মানে আস্থা, অংশগ্রহণ এবং পুরো প্রক্রিয়াটি জনগণের সামনে স্বচ্ছ রাখা। সেই জায়গায় যদি ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন বহনে নিষেধাজ্ঞা আসে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এতে আসলে কী সুরক্ষিত হচ্ছে আর কী আড়াল হচ্ছে।

নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, গোপন ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং অযথা ভিড় বা বিশৃঙ্খলা ঠেকানো জরুরি। বুথের ভেতরে মোবাইল ব্যবহার বন্ধ রাখার যুক্তি আছে। এতে ভোটার স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন, অন্য কেউ ছবি তুলে বা প্রভাব খাটিয়ে চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ পায় না। কিন্তু সেই যুক্তি কি কেন্দ্রের বাইরে একইভাবে প্রযোজ্য?

৪০০ গজের ভেতর মানে বাস্তবে একটি বড় এলাকা। ভোটার, এজেন্ট, পর্যবেক্ষক, সাংবাদিক, স্থানীয় মানুষ, সবার চলাচলের জায়গা এটি। এখানে মোবাইল না থাকার অর্থ হচ্ছে প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যা থাকলেও নথিবদ্ধ করার সুযোগ থাকবে না। কোনো অভিযোগ উঠলে সেটি তখন মুখের কথার ওপর নির্ভর করবে। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অসংখ্য ঘটনায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের মোবাইল ক্যামেরাই অনেক সত্য সামনে এনেছে, যা অন্যভাবে প্রমাণ করা কঠিন হতো।

আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো, বর্তমান সাংবাদিকতার একটি বড় অংশ মোবাইলনির্ভর। বিশেষ করে ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ছবি ও ভিডিও পাঠানোর জন্য রিপোর্টারদের হাতে মোবাইলই প্রধান ভরসা। কেন্দ্রের বিস্তৃত এলাকায় সেটি বন্ধ হলে তথ্যপ্রবাহে স্বাভাবিকভাবেই সীমাবদ্ধতা তৈরি হবে। ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত, যাচাইযোগ্য প্রমাণসহ খবর মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যাবে।

প্রশ্নটা এখানে নিষেধাজ্ঞা থাকা না থাকার চেয়েও বড়। প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কতটা উন্মুক্তভাবে দৃশ্যমান থাকবে। একটি বিশ্বাসযোগ্য ভোটের জন্য কেবল সুষ্ঠু হওয়াই যথেষ্ট নয়, সেটি সুষ্ঠু হয়েছে বলে মানুষকে বিশ্বাসও করাতে হয়। আর সেই বিশ্বাস তৈরির সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হচ্ছে স্বচ্ছতা, যেখানে প্রত্যক্ষদর্শীর চোখ আর ক্যামেরা দুটোই কাজ করতে পারে।

মোবাইল নিষিদ্ধ করলে অনিয়ম বন্ধ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যাবে, এটি প্রায় নিশ্চিত। ফলে বিতর্ক কমার বদলে অনেক সময় বাড়তেই পারে। কারণ মানুষ তখন ভাববে, যা ঘটেছে তা তারা দেখেনি, অন্য কেউও দেখাতে পারছে না।

গণতন্ত্রে আস্থার জায়গাটি খুব সংবেদনশীল। সেখানে সিদ্ধান্ত নিতে হয় এমনভাবে, যাতে নিরাপত্তা যেমন থাকে, তেমনি জনগণের জানার অধিকারও অক্ষুণ্ন থাকে। ৪০০ গজের এই সীমারেখা তাই শুধু ভৌগোলিক নয়, এটি স্বচ্ছতা আর সংশয়ের মাঝের দূরত্বও মাপতে শুরু করে।

নির্বাচনকে ঘিরে প্রত্যাশা সবসময়ই বেশি থাকে। মানুষ চায় নিশ্চিন্ত হতে, চায় দেখতে, জানতে, বুঝতে। সেই সুযোগ সংকুচিত হলে প্রশ্ন তৈরি হবেই। আর প্রশ্নের জবাব না মিললে আস্থা ফেরানো কঠিন হয়ে পড়ে।

(আগামীর সময় । ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)

মন্তব্যসমূহ