শিক্ষা হোক সম্ভাবনার দরজা, আর্থিক চাপ নয়
নতুন বছরে নতুন ক্লাসে ওঠার আনন্দটা অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই আর পুরোটা থাকে না। কারণ ক্লাস শুরুর আগেই অভিভাবকের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় দীর্ঘ একটি ফি তালিকা। শুধু বই-খাতা বা বেতন নয়, প্রায় ৩০টি আলাদা আলাদা খাতে টাকা দিতে হয়। তালিকাটি দেখলেই বোঝা যায়, বিষয়টি কতটা ভারী হয়ে উঠেছে।
ক্লাব ফি, সেশন ফি, সৌন্দর্যবর্ধন ফি, লাইব্রেরি ফি, চিকিৎসা ফি, রক্ষণাবেক্ষণ ফি, পানি ও বিদ্যুৎ ফি, ল্যাব ফি, আইসিটি ব্যবস্থাপনা ফি, পরিচয়পত্র ফি, খেলাধুলা ফি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ফি, ম্যাগাজিন ফি, ক্যালেন্ডার ফি, ডায়েরি ফি, সিলেবাস ফি, রিপোর্ট কার্ড ফি, পারিবারিক নিরাপত্তা ফি, দরিদ্র তহবিল, লাইব্রেরি কার্ড ফি, কাব বা স্কাউট ফি, বিএনসিসি ফি, উন্নয়ন ফি, বেতন বা টিউশন ফি, অনলাইন সুবিধা ফি, মিলাদ ফি, সার্ভিস চার্জ ও ভ্যাট, অনুপস্থিতি জরিমানা, ভর্তি ফি এবং এসএমএস চার্জ।
এই ফিগুলো নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেই অভিভাবকদের একই তালিকার মুখোমুখি হতে হয়। প্রশ্নটা এখানেই। সবগুলো ফি কি সত্যিই প্রতিবছর নেওয়া জরুরি? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, যেখানে যুক্তির চেয়ে নিয়মটাই বড় হয়ে উঠেছে?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ বা শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক পরিবেশ উন্নয়নের জন্য কিছু ফি থাকা স্বাভাবিক। লাইব্রেরি, ল্যাব, পানি-বিদ্যুৎ বা খেলাধুলার মতো খাতগুলোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এমন অনেক খাত আছে, যেগুলোর সুবিধা বহু শিক্ষার্থী কখনোই ব্যবহার করে না। তবু সবাইকে সমানভাবে সেই ফি দিতে হয়। এতে করে প্রয়োজন আর বাস্তবতার মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়।
অনেক অভিভাবকের জন্য এই অতিরিক্ত ফিগুলো বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। শহরের বাইরে বা স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন। স্কুলের বেতন দেওয়ার প্রস্তুতির পাশাপাশি এতগুলো আলাদা চার্জ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকেই হিসাব কষে চলতে হয়। শিক্ষার মতো একটি মৌলিক প্রয়োজন যখন আর্থিক চাপে পরিণত হয়, তখন সেটি সমাজের জন্য সুখকর বার্তা দেয় না।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্বচ্ছতার অভাব। কোন খাতে কত টাকা কেন নেওয়া হচ্ছে, সেটার স্পষ্ট ব্যাখ্যা অনেক সময় পাওয়া যায় না। অভিভাবকেরা জানতে চান, উন্নয়ন ফি বা সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠান কী ধরনের উন্নয়ন করছে। প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকলেও সন্তোষজনক জবাব সবসময় মেলে না।
শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়, এ কথা সত্য। কিন্তু শিক্ষার নামে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রয়োজনীয় ফি আর অপ্রয়োজনীয় চার্জের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা টানাই এখন সময়ের দাবি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক এবং অভিভাবকদের সম্মিলিত আলোচনার মাধ্যমেই এই বিষয়গুলো নতুন করে ভাবা দরকার।
নতুন বছরে শিক্ষার্থীরা নতুন ক্লাসে উঠবে, নতুন স্বপ্ন দেখবে। সেই স্বপ্নের শুরুটা যেন অযৌক্তিক ফি তালিকার ভারে চাপা না পড়ে। শিক্ষা হোক সম্ভাবনার দরজা, আর্থিক চাপ নয়।
মন্তব্যসমূহ