বস্তি আর বস্তি



ঢাকা শহরের ছবিটি বদলে গেছে। উঁচু দালান, ফ্লাইওভার, শপিং মল আর যানজটের মধ্যে আরেকটি ঢাকা চোখে পড়ে। সেটা বস্তির ঢাকা। শহরের প্রায় সব এলাকায় বস্তি এখন দৃশ্যমান। উচ্ছেদ অভিযান, ভবন নির্মাণ আর আগুনের খবর এই ঢাকা শহরের বস্তিকে প্রায়ই আলোচনায় নিয়ে আসে।

প্রথম আলোর খবরে বলা হয়েছে, শহরে বস্তির সংখ্যা কত এবং বস্তিতে কত মানুষ বাস করে, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ২০২২ সালের আরবান এরিয়া প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকায় বস্তির সংখ্যা ৪ হাজার ৭৬১। তবে পুরো ঢাকা মহানগরের এলাকা বিবেচনায় নিলে বস্তির সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষকেরা ইউনিসেফের উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন, ঢাকা শহরে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বস্তিতে বাস করে। বড় বস্তিগুলো খাসজমিতে গড়ে উঠেছে। তবে ৮০ শতাংশ বস্তি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে। বস্তির মানুষ অধিকাংশ ভাড়া বাসায় থাকেন। বস্তিতে ১০০ বর্গফুটের ভাড়া ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। বস্তির পরিবারগুলোর ২০ থেকে ৪০ শতাংশ অর্থ চলে যায় ঘর ভাড়ায়।
২০১৬ সালে ইউএনএফপিএর ‘বাংলাদেশে নগরায়ণ ও অভিবাসন’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার কোনো কোনো বস্তি অতি ঘনবসতিপূর্ণ; যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটার জায়গায় ২ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস করে। পৃথিবীর কোনো উন্নত শহরে এত মানুষ এমন ছোট জায়গায় গাদাগাদি করে বসবাস করেন না।
বস্তির এই বাস্তবতা শুধু চোখে পড়ে না, কানেও বাজে। সংকীর্ণ গলিপথ, অন্ধকার ঘর, নোংরা ড্রেন, টিন আর প্লাস্টিকের ঘেরা দেয়াল। তার সাথে থাকে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি। তবু মানুষ থাকে। থাকে কারণ শহর জীবিকার প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই প্রতিশ্রুতির বদলে তারা শহরকে দেয় শ্রম, ঘাম আর উৎপাদনশীলতা। নির্মাণকাজ, গার্মেন্টস, পরিবহন, বাজার, আবাসিক সেবা। এসব ক্ষেত্রের বড় অংশই চলে বস্তির মানুষের ওপর ভর করে।
ঢাকা যদি সত্যিই একটি বাসযোগ্য শহর হতে চায়, তাহলে শুধু কয়েকটি উচ্ছেদ অভিযান বা পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজ হবে না। প্রয়োজন পরিকল্পনাসহ আবাসন, সেবা, নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া। শহর যাদের শ্রমে দাঁড়িয়ে থাকে, সেই মানুষগুলোও যেন শহরের নাগরিক হিসেবে বাঁচতে পারে। এটাই এখন জরুরি।
ঢাকা বস্তির শহর হয়ে উঠেছে, এটা দুঃখজনক সত্য। আর সেই সত্যই বলে, নগরায়ণ শুধু বিল্ডিং নির্মাণ নয়, মানুষের জীবন সংগঠনেরও বিষয়। শহরের উন্নয়ন যদি মানুষের উন্নয়ন না হয়, তাহলে সেই নগরায়ণ কেবল কংক্রিটের স্তুপই তৈরি করে যাবে।

মন্তব্যসমূহ