এক মেয়ের লড়াই, এক বাবার সাহস
বিয়ের পর নতুন জীবনের স্বপ্নে যখন শাজিয়া বানু স্বামী আব্বাস খানের বাড়িতে যান, তখন প্রথমে তার চোখ আটকে যায় রান্নাঘরের তিনটি প্রেসার কুকারে। একটির রাবার ছেঁড়া, আরেকটির হুইসেল ভাঙা আর একটি প্রায় নতুন। জিজ্ঞেস করতেই তিনি জানেন, যখন একটি কুকার নষ্ট হয়, খান সাহেব সেটি ঠিক করার প্রয়োজন বোধ করেন না। নতুন কুকার কিনে আনেন। সেই তুলনা যেন তার পরবর্তী জীবনের ভবিষ্যৎ বলে দেয়, যখন বানুর সঙ্গে আচরণও সেই কুকারের মতোই হয়ে যায়।
এটি শাজিয়া বানুর গল্প; সাধারণ সংসার, স্বামী, তিন সন্তান এবং ঠাসবুনোট এক পরিবার। হঠাৎ একদিন সেই পরিবার ভেঙে দুই ভাগ হয়ে যায়। আব্বাস খান দ্বিতীয় স্ত্রী নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করেন। শাজিয়া বেছে নেন বিদায়, কিন্তু বিচ্ছেদ নয়। কারণ তার কাছে সংসার শুধু সম্পর্কের বিষয় ছিল না, সন্তানদের অধিকার, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার প্রশ্নও ছিল।
স্বামী ভরণপোষণ বন্ধ করে দিলে বানুর সামনে আদালতের দরজা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। সেই দরজাই তাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়, যেখানে নারীর লড়াই শুধু নিজের জন্য নয়, আরেক নারীর, আরেক সন্তানের, আরেক ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়।
সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় থাকা ‘হক’ সিনেমাটি সেই লড়াইকে খুব শান্ত অথচ গভীরভাবে দেখিয়েছে। কোনো অতিরঞ্জন নেই, নেই কান্নার দৃশ্যকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা। আছে নিখুঁত লেখা, নিখুঁত অভিনয়, আর একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা।
সিনেমাটি বারবার মনে করিয়ে দেয়, কুরআন শুধু পড়া আর কুরআনের বিধান বোঝার মধ্যে ফারাক কত বড়। ধর্মের ব্যাখ্যার আড়ালে একজন স্ত্রী, একজন মা, একজন নারীর ন্যায্য অধিকার কত সহজে চাপা পড়ে যায়। সেই চাপা পড়া অধিকার আদালতে গিয়ে যেন নতুন করে শব্দ পায়। যখন বানু বলে, তাদের শিশুরা জীবনের হিসাব মেলায় শুনানির তারিখ দিয়ে, খেলার মাঠ নয়; তখন কথা নয়, নিঃশ্বাস আটকে যায়।
তবে গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্রটি আমার চোখে বানুর বাবা। সমাজের এক সময়ের রূঢ় ধারণা ছিল, বিয়ের পর মেয়ের সুখ-দুঃখ আর বাবা-মায়ের বিষয় নয়। মেয়ের সংসার মানেই তার নিয়তি। সেই নিয়তির ভেতরেই ছিল অব্যক্ত ব্যথা, চুপচাপ নিঃশেষ হওয়া, আর বোঝা হয়ে থাকার ভয়। কিন্তু বানুর বাবা সেই ভয় ভাঙেন।
তিনি বলেন, যাই হোক, আমি আছি তোমার পাশে। এই সাধারণ বাক্যটি পুরো গল্পটিকে অন্য মাত্রা দেয়। জীবনে যারা এমন বাক্যের শক্তি উপলব্ধি করেছে, তারা জানে একটি মেয়ে শুধু এই কথাটুকু পেলে ভেঙে পড়া জায়গা থেকে আবার দাঁড়াতে পারে। এই কথাটি তাকে বলে দেয় যে সে একা নয়, তার পাশে একজন আছে, যিনি শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়, নৈতিকতায়ও তাকে সমর্থন করেন।
আমাদের সমাজে বিবাহিত মেয়েরা নিজের পরিবারেই কীভাবে অদৃশ্য বোঝা হয়ে যায়। মেয়েটা সুখী কিনা, নিরাপদ কিনা, মরছে না বাঁচছে। এই প্রশ্নগুলো আমাদের সংস্কৃতিতে খুব কমই উচ্চারিত হয়। কিন্তু একজন বাবা যখন নিজের মেয়েকে বোঝা মনে না করে, বরং তাকে মর্যাদা দেয়, তখন সেই পরিবারই হয়ে ওঠে নারীর ক্ষমতায়নের প্রথম পাঠশালা।
'হক' সিনেমাটি নারীর অধিকার, পরিবারের ভূমিকা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির গল্প। সবচেয়ে বড় কথা, এটি সেই বাবাদের গল্প যাঁরা নীরবে মেয়েদের পর্দার আড়াল থেকে শক্তি দেন। এই শক্তি সবসময় দৃশ্যমান না হলেও সেটাই মেয়েকে লড়াই করতে শেখায়। শেষ পর্যন্ত বানুর লড়াই কোনো নারীবাদী স্লোগানের জন্য নয়। ছিল তার অস্তিত্বের ন্যায়বিচারের জন্য। আর সেই ন্যায়বিচারের পথে একজন বাবার উচ্চারিত একটি বাক্যই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় আলো।
মন্তব্যসমূহ