স্কুলে অমানবিকতা আর আমাদের জবাবদিহির সংকট

 


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি শিশু নির্যাতনের ভিডিও দেখার পর অনেকেই হতবাক হয়েছেন এবং ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, অভিভাবকত্ব এবং সমাজের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুল পোশাক পরা চার বছরের কম বয়সী একটি শিশুকে অফিসকক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রথমে একজন নারী শিশুটিকে চড় দেন। এরপর একজন পুরুষ শিশুটিকে জোরে ধরে কখনো মুখ, কখনো গলা চেপে ধরতে থাকেন। হাতের স্ট্যাপলারও দিয়ে ভয় দেখান। শিশুটি কাঁদে, আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে। নারী শিশুটির হাত আটকে রাখে। একপর্যায়ে শিশুটি নারীর শাড়িতে থুতু ফেললে সেই জায়গায় শিশুটির মুখ চেপে ধরা হয় এবং মাথা কয়েকবার ঝাঁকানো হয়। এই দৃশ্য দেখেছে গোটা দেশ।

রাজধানীর নয়াপল্টনের মসজিদ রোডে শারমিন একাডেমি নামের স্কুলে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক এই ঘটনা দেশজুড়ে এখন আলোচনায়। ভিডিওর নারীটি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান এবং পুরুষটি স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার। পুলিশ বলছে, তারা স্বামী-স্ত্রী। শিশুটি তাদের স্কুলের শিক্ষার্থী। প্রি প্লে শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল মাত্র এক সপ্তাহ আগে। সেই ছোট্ট শিক্ষাজীবনের শুরুতেই যে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হলো তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। অল্প বয়সী শিশুটি এখনো আতঙ্কে। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ঘুমের মধ্যেও চিৎকার করে ওঠে এবং বলে মুখ সিলি করে দিয়ো না। বলে স্কুলে আর যাবে না।

এই ভিডিও আমাদের শিক্ষা পরিবেশের প্রতি এক গভীর সতর্কবার্তা। শিশু যখন স্কুলে যায়, তখন পরিবার বিশ্বাস করে সেখানে নিরাপত্তা, স্নেহ ও শৃঙ্খলার মিশ্রণে শেখার পরিবেশ থাকবে। সেখানে যদি নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে, তাহলে শিশুর মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয় তা সহজে সারার নয়। বিশেষ করে চার বছরের কম বয়সী একটি শিশুর ওপর এমন আচরণ কেবল শারীরিক নির্যাতন নয়, মানসিক আঘাতও।

এই ঘটনার আরেক দিক রয়েছে, তা হলো আমাদের অভিভাবক মনস্তত্ত্ব। ভিডিও দেখার পর অনেকের ভেতর ক্ষোভ জন্মেছে। কেউ কেউ বলছেন, এই শিশু যদি আমার হতো তবে আমি চুপ থাকতাম না। এই প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক। তবে সমাজের প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত আইন ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ব্যক্তিগত প্রতিশোধের জায়গা না খুলে সঠিক বিচার ও শিশু সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার উন্নয়নই জরুরি। 

এখন প্রশ্ন উঠছে এমন স্কুলগুলো কিভাবে চলছে, কারা তত্ত্বাবধান করছে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে কি না, কোনো মানদণ্ড আছে কি না এবং থাকলে তা মানা হচ্ছে কি না। একটি শিশুর সুরক্ষার বিষয়টি কেবল পরিবার বা স্কুলের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

আজকের ঘটনা আগামী দিনের শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রি প্লে বা নার্সারি বয়সই শিশুর সামাজিকীকরণের শুরু। সেখানে যদি ভয়, চাপ, অপমান বা সহিংসতার অভিজ্ঞতা তৈরি হয়, তা শিশুর আস্থার ভিতকে দুর্বল করে। শিশু নিরাপত্তা ও মনস্তাত্ত্বিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। শিশুকে বড় করার কাজে স্নেহ ও ধৈর্য গুরুত্বপূর্ণ।

এই ঘটনার বিচার হবে কি না, আইনি প্রক্রিয়া কোথায় যাবে সে প্রশ্নের উত্তর সময় দেবে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, ভিডিওটি আমাদের সমাজের সামনে আয়না ধরেছে। সেই আয়নায় আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক ও ব্যবস্থাপনার মাঝে থাকা দুর্বলতাগুলো স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি। এখন দায়িত্ব সবার, যাতে শিশুরা নিরাপদ পরিবেশে বড় হতে পারে এবং স্কুল শব্দটির সঙ্গে ভয় নয়, শেখা, আনন্দ আর স্নেহের স্মৃতি জড়িয়ে থাকে।

মন্তব্যসমূহ