রাতের মেট্রো থেকে নেমে একটা পায়ে চালিত রিকশায় উঠলাম। চারপাশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ভিড়। একটা ডানে কাটছে, আরেকটা বামে। রিকশাচালক প্রাণপণে প্যাডেল মারছেন, কিন্তু গতির লড়াইয়ে তিনি স্পষ্টতই পিছিয়ে। তাকে বললাম, এত তাড়ার দরকার নেই, আস্তে যান। তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, 'ব্যাটারিদের জন্য তো আর রিকশা টানাই যায় না।' কথাটা ছোট, কিন্তু ভেতরে অনেক কষ্ট লুকানো।
খেয়াল করলাম, ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর বেপরোয়া গতির কারণে পায়ে চালিত রিকশাচালকেরা রাস্তায় রীতিমতো জড়োসড়ো হয়ে চলেন। দুর্ঘটনার ভয় তাদের তাড়া করে বেড়ায়। এই শহরে তারা যেন ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। জিজ্ঞেস করলাম, আপনিও তাহলে অটো নিলেন না কেন? উত্তর এলো সহজ কিন্তু ভারী, 'অটোতে খরচ বেশি, আমার কাছে অতো টাহা নাই।' এই একটি বাক্যেই আসলে ঢাকার রাস্তার দুই ভুবনের গল্প বলা হয়ে যায়।
ব্যাটারিচালিত রিকশা কিনতে বা ভাড়া নিতে যে মূলধন লাগে, তা অনেক গরিব রিকশাচালকের নাগালের বাইরে। তাই তারা পুরনো রিকশায় রয়ে যান এবং প্রতিদিন এমন একটি রাস্তায় নামেন, যেখানে প্রতিযোগিতাটা আর সমান নেই। একজন মানুষের শরীরের শক্তি আর একটি মেশিনের গতির মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় না, হওয়ার কথাও নয়। তবু তারা নামেন, কারণ সংসার চালাতে হবে।
ঢাকার রাস্তায় এখন পায়ে চালিত রিকশা দিন দিন কমছে। অটোরিকশার দাপটে তারা কার্যত টিকে থাকার লড়াই করছে। এই পরিবর্তন একদিনে হয়নি। ধীরে ধীরে ব্যাটারিচালিত রিকশা শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। যাত্রীরাও সুবিধার কথা ভেবে অটোতেই উঠছেন বেশি। ফলে পায়ে চালিত রিকশাচালকদের আয় কমেছে, রুট সংকুচিত হয়েছে, মর্যাদাও কমেছে অনেকটা।
প্রশ্নটা তাই শুধু যানবাহনের নয়, প্রশ্নটা বৈষম্যের। এক শহরে দুই ধরনের যানবাহন পাশাপাশি চলবে, এটা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু যখন একটি শ্রেণির চালক কেবল মূলধনের অভাবে পিছিয়ে পড়েন এবং রাস্তায় প্রতিদিন নিজের শরীর দিয়ে একটি অসম যুদ্ধ লড়েন, তখন সেটা আর শুধু বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা থাকে না।
শহর বদলাবে, প্রযুক্তি আসবে, যানবাহন পাল্টাবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বদলের এই স্রোতে যারা সাঁতার কাটতে পারছেন না, তাদের জন্য কি কোনো ভাবনা আছে? রাষ্ট্র কি ভেবেছে, যে রিকশাচালক আজ অটোয় যেতে পারছেন না, তাকে কীভাবে এই রূপান্তরে সঙ্গে নেওয়া যায়?
সেদিন রাতে রিকশাচালক আমাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন। ঘাম মুছলেন, ভাড়া নিলেন। তারপর অন্ধকারে আবার প্যাডেলে পা দিলেন। পেছনে তখনো ব্যাটারির আলো ছুটছে দ্রুত। তিনি তাকালেন না সেদিকে। তাকানোর সময় নেই, সংসার আছে।