সকালে ঘুম থেকে উঠে টুথব্রাশ হাতে নেওয়া থেকে শুরু। তারপর প্লাস্টিকের বোতলে পানি, প্লাস্টিকের কৌটায় নাস্তা, প্লাস্টিকের ব্যাগে বাজার। অফিসে গেলে প্লাস্টিকের কলম, প্লাস্টিকের চেয়ার। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্লাস্টিকের বোতল থেকে আরেক চুমুক পানি। দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্লাস্টিক এত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে যে তাকে আলাদা করে চেনাই কঠিন। এটা এখন আর শুধু উপকরণ নয়, এটা জীবনযাপনের একটি ভাষা হয়ে গেছে। কিন্তু এই ভাষাটি আমাদের ধীরে ধীরে গ্রাস করছে।
প্লাস্টিকের সমস্যা কেবল এই নয় যে এটা পরিবেশ নষ্ট করে। সমস্যা হলো, এটা নষ্ট হয় না। একটি পলিথিন ব্যাগ মাটিতে মিশে যেতে সময় লাগে শত শত বছর। একটি প্লাস্টিকের বোতল টিকে থাকে কয়েকশো বছর। অর্থাৎ আজ যে বোতলটি ছুড়ে ফেলা হলো, সেটি আমাদের বহু প্রজন্ম পরেও পৃথিবীতে থাকবে। শুধু থাকবে না, ক্ষতি করতে থাকবে।
বাংলাদেশের চিত্রটা একটু আলাদাভাবে দেখা দরকার। এখানে প্রতিদিন যে পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, তার বড় একটি অংশ সংগ্রহই হয় না। ঢাকার খাল, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু নদী, এই জলাশয়গুলোতে প্লাস্টিক এখন পানির মতোই স্বাভাবিক উপস্থিতি। বন্যার মৌসুমে এই প্লাস্টিক ড্রেন আটকায়, জলাবদ্ধতা তৈরি করে, শহর ডোবায়। তখন মানুষ বলে, ড্রেনেজ সিস্টেম খারাপ। আসল সমস্যাটা থেকে যায় আড়ালে।
সমুদ্রের গল্পটা আরও ভয়াবহ। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় এক কোটি টন প্লাস্টিক সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। এই প্লাস্টিক সূর্যের আলো আর ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙে ছোট হতে থাকে, কিন্তু মেলায় না। একসময় এটি পরিণত হয় মাইক্রোপ্লাস্টিকে, চোখে দেখা যায় না এমন ক্ষুদ্র কণায়। মাছ এই কণা গেলে, সেই মাছ মানুষ খায়। অর্থাৎ প্লাস্টিক ঘুরে আসছে আমাদের থালায়।
কয়েক বছর আগেও এটি একটি আশঙ্কা ছিল। এখন এটি প্রমাণিত সত্য। গবেষণায় মানুষের রক্তে, ফুসফুসে, এমনকি মায়ের বুকের দুধেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। শরীরে এই কণার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে, প্রদাহ তৈরি করতে পারে এবং কোষের স্বাভাবিক কাজে বাধা দিতে পারে।
প্লাস্টিক শিল্প পৃথিবীতে এসেছিল সুবিধার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। হালকা, সস্তা, টেকসই। কাচের বদলে প্লাস্টিক, পাটের বদলে পলিথিন, ধাতুর বদলে প্লাস্টিক। প্রতিটি বিকল্পকে মনে হয়েছিল প্রগতি। কিন্তু "টেকসই" শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল বিপদ। যা সহজে নষ্ট হয় না, তা পরিবেশের জন্য দুঃস্বপ্ন।
সমস্যার আরেকটি দিক হলো, প্লাস্টিকের বিকল্প জানা থাকলেও অভ্যাস বদলানো কঠিন। পাটের ব্যাগ ব্যবহার করা যায়, কিন্তু দোকানদার পলিথিন দিলে না করা যায় না বেশিরভাগ সময়। কাচের বোতলে পানি রাখা যায়, কিন্তু বাইরে বেরোলে প্লাস্টিকের বোতল কিনতে হয় কারণ বিকল্প সহজলভ্য নয়। ব্যক্তির ইচ্ছা থাকলেই সমস্যার সমাধান হয় না, কাঠামোটাও বদলাতে হয়।
বাংলাদেশে ২০০২ সালে পলিথিন নিষিদ্ধ হয়েছিল। সেটি পৃথিবীর প্রথম দেশগুলোর একটি হিসেবে একটি সাহসী পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু বাস্তবায়ন যেভাবে হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে হয়নি। পলিথিন এখনো বাজারে আছে, রাস্তায় আছে, নদীতে আছে। আইন একা পরিবর্তন আনতে পারে না, যদি না মানুষের অভ্যাস আর বাজারের সরবরাহ একসঙ্গে না বদলায়।
তবু কিছু আশার কথাও আছে। তরুণ উদ্যোক্তারা পাট, বাঁশ, কলার ছাল থেকে পরিবেশবান্ধব মোড়ক তৈরি করছেন। কিছু সুপারশপ প্লাস্টিক প্যাকেজিং কমিয়ে আনছে। স্কুলে পরিবেশ শিক্ষার জায়গা একটু একটু বাড়ছে। এই উদ্যোগগুলো ছোট, কিন্তু দিক ঠিক আছে।
প্লাস্টিক পুরোপুরি জীবন থেকে সরানো সম্ভব নয় এই মুহূর্তে। কিন্তু ব্যবহার কমানো সম্ভব। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়ানো সম্ভব। যে প্লাস্টিক ইতিমধ্যে ব্যবহার হয়েছে, তা ঠিকমতো আলাদা করে ফেলা সম্ভব। ছোট ছোট এই অভ্যাসগুলো মিলিয়ে একটি বড় পার্থক্য তৈরি হয়।
যে জিনিস পাঁচশো বছরেও মরে না, সে জিনিসকে যত্রতত্র ছুড়ে ফেলা মানে আসলে ভবিষ্যৎকে ছুড়ে ফেলা। সেই ভবিষ্যতে আমরা থাকব না, কিন্তু আমাদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক থাকবে। এটুকু মনে রাখলেই হয়তো পরের বার ব্যাগটা সঙ্গে নিয়ে বের হওয়া একটু সহজ হবে।